ক্রিকেট ও ফুটবল বাদে বাংলাদেশের নারী ক্রীড়া এখনো মূলধারার খেলাধুলা থেকে অনেক পিছিয়ে। দেশের নারী অ্যাথলেটরা বিভিন্ন খেলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশ নিচ্ছেন ঠিকই, তবে ভালো মানের অনুশীলনের সুযোগ পান কেবল হাতে গোনা কয়েকজন।
দক্ষিণ এশিয়ার গেমসে কিছু সাফল্য থাকলেও অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস কিংবা কমনওয়েলথ গেমসের মতো বড় আসরে বড় কোনো সাফল্য নেই বললেই চলে। ভালো শুরুর পরও ধারাবাহিক ফলাফল ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন নারী খেলোয়াড়রা।
তথ্য বলছে, ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত দক্ষিণ এশীয় (এসএ) গেমসে ২১৭টি পদক জিতেছে বাংলাদেশ। কিন্তু একই সময়ে এশিয়ান গেমস ও কমনওয়েলথ গেমসে অর্জন মাত্র ৫টি পদক। এর মধ্যে নারীদের ঝুলিতে গেছে কেবল দুটি: ২০২২-২৩ এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটে ব্রোঞ্জ এবং ২০২৬ এশিয়ান গেমসে উশুতে ব্রোঞ্জ।
এবারের এশিয়ান গেমসে জিনাত আক্তারের ব্রোঞ্জ পদকটি সেই স্বল্প প্রাপ্তির খাতারই অংশ, যা অর্জনের পেছনের কঠিন সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত উশু অ্যাথলেট জিনাত নারীদের ৫২ কেজি সান্ডা ক্যাটাগরিতে ব্রোঞ্জ জিতেছেন, যা এবারের আসরে দেশের একমাত্র পদক। এর মাধ্যমে গেমসে ব্যক্তিগত পদক পাওয়ার দীর্ঘ ৪০ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে।
এর আগে ১৯৮৬ সালে সিউলে বক্সার মোশাররফ হোসেন ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। এসএ এবং এশিয়ান গেমসে এর আগে নারীরা কাবাডি, ভারোত্তলন, আর্চারি, ক্রিকেট ও উশুতে পদক এনে দিয়েছেন।
কেন পিছিয়ে পড়ছে প্রতিভা?
ক্রীড়াবিদ, কিংবদন্তি খেলোয়াড় এবং ফেডারেশনগুলোর সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই প্রতিভার স্থায়ী ও ভালো ফলাফলে রূপ না নেওয়ার পেছনের কারণ কম ম্যাচ খেলা, অনুশীলনে ধারাবাহিকতার অভাব, ফিটনেসের ঘাটতি এবং ঘরের ভেতর থেকে শুরু হওয়া বিভিন্ন সামাজিক বাধা।
জাতীয় বক্সার ও বিকেএসপির সাবেক শিক্ষার্থী আফরা খন্দকার টাইমসকে বলেন, বড় মঞ্চে পৌঁছানোর পথটাই অত্যন্ত কঠিন।
ভারতের সাথে তুলনা করে তিনি জানান, ভারতে বক্সাররা বড় টুর্নামেন্টের আগে বহু জেলা ও স্কুল পর্যায়ে খেলে নিজেদের পোক্ত করে আসরে নামে। অথচ বাংলাদেশে সরাসরি জাতীয় টুর্নামেন্ট ও তিন মাসের ক্যাম্প করে সরাসরি এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া হয়। ফুটবল ও ক্রিকেট বাদে বক্সিং বা অন্যান্য খেলায় মেয়েরা নামমাত্র ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়।
প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও ভেন্যু সংকট
জিনাতের অভিজ্ঞতা দেখায়, খেলাধুলায় সাফল্যে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা কতটা জরুরি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাকে সব ধরনের সুবিহাসান ফাহিমধা দিলেও সাধারণ উশু খেলোয়াড়দের নিজস্ব কোনো ভেন্যুই নেই। ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো সারা বছরব্যাপী ক্যাম্প ও দুই বেলা অনুশীলনের সুযোগ না থাকায় অন্যান্য ডিসিপ্লিনের খেলোয়াড়রাও পিছিয়ে পড়ছেন।
টেবিল টেনিসের কিংবদন্তি, স্বাধীনতা পদক বিজয়ী ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী জোবেরা রহমান লিনু জানান, জাতীয় ক্যাম্পগুলো মাত্র কয়েক দিন চলেই বন্ধ হয়ে যায়। এতে খেলোয়াড়দের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের একাংশের মানসিকতাও বড় সমস্যা—তারা টুর্নামেন্টের দুই মাস আগে প্র্যাকটিস করে বাকি সময় বিরতিতে চলে যান। এছাড়া তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে জিম ব্যবহারের অনীহা ও ফিটনেসের ঘাটতিও স্পষ্ট।
নারী ক্রীড়ার আরেক কিংবদন্তি ব্যাডমিন্টনের সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ও বাংলাদেশ উইমেন্স স্পোর্টস ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুন নাহার ডানা বলেন, জেলা পর্যায়ে সাঁতারের সুইমিংপুলগুলো রক্ষণাবেক্ষণের উচ্চ খরচের কারণে অব্যবহৃত পড়ে থাকে।
মাঠের ঘাটতি এবং সঠিক সুযোগ-সুবিধার অভাবের কারণে উন্নয়নের প্রত্যাশা করা বোকামি ছাড়া কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নিরাপত্তা
আফরা খন্দকার জানান, দূর-দূরান্তের এলাকার মেয়েদেরকে পরিবার থেকে প্রায়ই খেলাধুলায় ‘না’ শুনতে হয়। মাঠে খেলতে গেলে স্থানীয়দের বাঁকা চোখের দৃষ্টি এবং প্রতিবেশীদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নারী অ্যাথলেটদের মানসিকভাবে চাপে ফেলে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশন ও ওয়ার্ল্ড আর্চারি এশিয়ার সভাপতি কাজী রাজিব উদ্দিন আহমেদ চপল বলেন, ২০১৯ সালের এসএ গেমসে আর্চারিতে ১০টি স্বর্ণ এবং ইসলামিক সলিডারি গেমসে নারীদের পদক প্রমাণ করে নিরবচ্ছিন্ন কাজ কী ফল দিতে পারে। তিনি নারীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং পরিবারকে রাজি করাতে গৃহশিক্ষক ও স্কুল ম্যানেজমেন্টের সাথে যোগাযোগের মতো ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণে একটি কেন্দ্রীয়, স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির দাবি জানান তিনি।
সমাধান ও প্রত্যাশার আলো
কামরুন নাহার ডানা মনে করেন, ছোট বয়স থেকেই অ্যাকাডেমির মাধ্যমে খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের উপযুক্ত পুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
হঠাৎ পাওয়া তারকাখ্যাতি যেন খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মতুষ্টির জন্ম না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক করে জোবেরা রহমান লিনু বলেন, ফেডারেশন সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু মাঠে ঘাম খেলোয়াড়কেই ঝরাতে হবে।
নারী ক্রীড়ার এই সংকট উত্তরণে সমাজের মানসিকতা বদলানোর ওপর জোর দিয়ে এই টেবিল টেনিস তারকা বলেন, বিলবোর্ডে এবং শ্রেণিকক্ষে যখন নারী অ্যাথলেটদের সম্মান জানানো হবে এবং একটি ছোট মেয়ে টিভিতে তার প্রিয় খেলোয়াড়কে শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হতে দেখবে, কেবল তখনই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।


