২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নারীর উন্নয়ন ও লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করতে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার বরাদ্দ রাখতে যাচ্ছে সরকার, যা মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং জিডিপির ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
এই খাতে এই বরাদ্দ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সরকারের দাবি, এই বরাদ্দ নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ক্ষমতায়নকে আরও এগিয়ে নেবে।
জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন স্পষ্ট। সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। এর আওতায় চার কোটি প্রান্তিক পরিবারের নারী প্রধানের নামে কার্ড ইস্যু করা হবে। কার্ডধারীরা প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা অথবা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা পাবেন।
দুজন বিশ্লেষক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, এটি শুধু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নয় বরং গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের নারীদের সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনার একটি বড় রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। এর ফলে পরিবারের আর্থিক লেনদেনে নারীর ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়তে পারে।
তবে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বিপুল বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত সামাজিক পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বলেও মনে করেন তারা।
সরকার নারী শিক্ষায় নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আগে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ থাকলেও এখন স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত নারীদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পাচ্ছে এবং সেই অর্থ সরাসরি মায়েদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হচ্ছে। সরকারের মতে, এটি নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা বাড়াচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই সুযোগ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব বা পক্ষপাতিত্ব রোধে কী ধরনের নজরদারি থাকবে।
সামগ্রিক জেন্ডার বাজেট বাড়লেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের হার কমেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার বরাদ্দের হার ৬৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে তা ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। আইসিটি বিভাগে বরাদ্দ ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এমন সময়ে এই হ্রাস ঘটছে যখন নারী স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা সরকার নিজেই স্বীকার করছে।
নারী উন্নয়নের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে প্রযুক্তি, ডিজিটাল দক্ষতা ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব খাতে বরাদ্দের নিম্নমুখী প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অ্যাকশন এগেইনস্ট ট্রাফিকিং অ্যান্ড সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন অব চিলড্রেন দক্ষিণ এশিয়ার চেয়ারপারসন সালমা আলী টাইমসকে বলেন, ‘বাজেটের আকার নয় বরং বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।’
তার ভাষায়, ‘কেবল বাজেট দিলেই হবে না। টাকা কোথায় খরচ হলো, কারা সুবিধা পেল, সেটার স্বচ্ছতা থাকতে হবে। বরাদ্দ বাড়ছে কিন্তু বাস্তবে নারী ও শিশুদের জন্য সেবার মান কতটা উন্নত হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।’
তিনি বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, মানবপাচারবিরোধী আইন, সাইবার সহিংসতা মোকাবিলা কিংবা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার—সব ক্ষেত্রেই বাজেট বরাদ্দ এবং বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে।
‘আইন থাকলেই হবে না, আইন কার্যকর করার জন্য অর্থ বরাদ্দ ও পর্যবেক্ষণ দরকার,’- বলেন তিনি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ। তবে কর্মরত নারীদের প্রায় ৯৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে মজুরি কম এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রায় অনুপস্থিত।
একইভাবে মাতৃমৃত্যু হার কমলেও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় অগ্রগতি এখনো হয়নি। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, পুষ্টিহীনতা এবং বাল্যবিবাহ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
শিশু সুরক্ষায়ও ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসুরক্ষা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং নিরাপদ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেসরকারি সংস্থা চিলড্রেন ড্রিমসের প্রতিষ্ঠাতা আলমগীর সুজন বলেন, ‘নারী ও শিশুদের জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ দিয়েছে, কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে বরাদ্দ ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক থাকে। শিশু সুরক্ষা, স্কুলভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের পুনর্বাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে বাজেটের সাফল্য কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এখন প্রয়োজন বরাদ্দের চেয়ে বেশি জবাবদিহি ও কার্যকর বাস্তবায়ন।’


