সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর পাসের হার নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। একইসঙ্গে পাসের হার কমাকে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন হিসেবেও অভিহিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন আসলে কীভাবে হতে পারে? সাফল্য বা ব্যর্থতা কোনটি? এসব নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেছেন টাইম অব বাংলাদেশের প্রতিবেদক আলীম হায়দার।
এই শিক্ষাবিদ মনে করেন, সরকারের চাইলে শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সরকারকে তা অবশ্যই নীতিমালা মেনে সঠিক পদ্ধতিতে করতে হবে। নাহলে বিশৃঙ্খলভাবে অনেক উদ্যোগ নিয়েও কোনো লাভ হবে না, সেই পুরনো দুষ্টচক্রেই শিক্ষাব্যবস্থা বন্দী হয়ে থাকবে।
টাইমস: এসএসসির ফলাফল কি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানহীনতার বিষয়টিই প্রকাশ করল, ভালো প্রতিষ্ঠানের ফলাফল তো খারাপ হয়নি?
অধ্যাপক মজিবুর: তা অস্বীকার করতে পারব না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকের ঘাটতি আছে, ভালো শিক্ষকের ঘাটতি আছে, শিক্ষার পরিবেশের ঘাটতি আছে। আমাদের তো সমস্যার শেষ নেই। নিজস্ব ক্যাপাসিটির চেয়ে তো কেউ বেশি ভালো করতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক।
তবে ভালো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু ব্যবস্থাপনা ও কৌশল থাকে। তারা সরকারের ওপর নির্ভর না করেও নিজেরা নিজেদের মতো করে শিক্ষাব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পেরেছে। এজন্য সেসব প্রতিষ্ঠানে পড়ার জন্য সবাই আগ্রহী হয়ে থাকে।
টাইমস: পাসের হার কমার পর শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন সুন্দর ফল হয়েছে। যেন পাসের হার কমায় সরকার অখুশি না। সরকারে এমন মনোভাব থাকলে শিক্ষা কীভাবে এগোবে?
অধ্যাপক মজিবুর: এর উত্তর হলো একদমই না। পাসের হার বেশি হওয়াও যেমন ঠিক না, তেমন কম হওয়াও ঠিক না। শিক্ষার্থীরা কী শিখল, কতখানি শিখল-সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ১০ বছর পড়ার পর ৬ লাখ শিক্ষার্থীর ফেল করবে কেন? তারমানে শিক্ষাব্যবস্থাপনায় বড় রকমের সমস্যা আছে। এটাকে সাফল্য হিসেবে দেখা উচিত না। বরং কীভাবে এই পরিস্থিতির উন্নতি করা করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন।
টাইমস: কয়েকশ স্কুলে একজনও পাস করতে পারেনি। আর বছরের পর বছর ধরেই শোনা যাচ্ছে ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা। এসব সমস্যার সমাধান কি আসলে অসম্ভব?
অধ্যাপক মজিবুর: সমাধান চাইলে সমাধান সম্ভব। ওই রকমের ক্যালিবার সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। কোথাও হয়ত পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকই নেই। সেখানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকও নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এখন গুণগত এবং পরিমাণ দুটো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে হলে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না, স্বজনপ্রীতি থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না। এমনকি শিক্ষকদের জন্য ভালো বেতনের ব্যবস্থাও করতে হবে। মানসম্পন্ন জীবনযাপনের নিশ্চয়তা না থাকলে ভালো শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতায় কেন আসবে?
টাইমস: দেশে হাজারো স্কুল গড়ে উঠেছে, কিন্তু মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে মান নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন?
অধ্যাপক মজিবুর: এটা দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়, বৈষম্যের বিষয়। আমরা বা আমাদের নীতিনির্ধারকরা শুধু নিজেদের ছেলেমেয়েদের মানোন্নয়ন ছাড়া আর অন্যদেরটা ভাবতে পারি না। এটা একটা সমস্যা। ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এরকম শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে এই সংকট সৃষ্টি হতো না।
পাহাড়ে, হাওড়ে, চরাঞ্চলে একেক রকম পরিবেশের সঙ্গে মানানসই শিক্ষাপদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাহলে শহরে ও গ্রামের প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও তেমন পার্থক্য থাকত না। সব প্রতিষ্ঠান মোটামুটি একটা সমান স্টান্ডার্ডে চলে আসত।
টাইমস: কিন্তু ভালো শিক্ষকরা কী গ্রামে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাবেন?
অধ্যাপক মজিবুর: নতুন ছেলেমেয়েরা যখন শিক্ষকতায় আসেন, তারা প্রাণশক্তিতে ভরপুর থাকেন। মালয়েশিয়াতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষকতায় যাদের পাঠানো হয়, তাদের জন্য এলাকাভেদে কোথাও ১০ শতাংশ, কোথাও ২০ শতাংশ ইনসেনটিভ দেওয়া হয়।
আমাদের দেশেও যদি এই ব্যবস্থা চালু করা যায়, তাহলে চাকরির প্রথম চার-পাঁচ বছর তরুণ শিক্ষকরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পড়াতে যাবেন। এতে তাদের শিক্ষার্থীদের শেখানোর স্পৃহাও যেমন মিটবে, তেমনি ওই অতিরিক্ত অর্থ পেয়ে নিজেদেরও প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
টাইমস: শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তো নতুন নয়। যাকে তাকে নিয়োগ, পাশাপাশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এভাবে কি চলতে পারে?
অধ্যাপক মজিবুর: না। আমরা নাজুক অবস্থায় আছি। এভাবে চলতে দেওয়া উচিতও নয়। শিক্ষার দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
শিক্ষকতায় দলীয় নিয়োগ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এসব বন্ধ করতে হবে। আগে আমাদের স্মার্ট শিক্ষক প্রয়োজন, নাকি ক্লাসরুমে স্মার্ট বোর্ড প্রয়োজন-সেই অগ্রাধিকার আগে ঠিক করতে হবে।
টাইমস: অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ আসে, শিক্ষকরা ক্লাসে পড়ানোর চেয়ে বেশি মনোযোগী থাকেন প্রাইভেট পড়াতে।
অধ্যাপক মজিবুর: এটি দুটি কারণে হয়। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে। প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যখন পুরোপুরি শিখতে পারে না, তখন তারা বাইরে প্রাইভেট বা বিকল্প টিউশন নিতে যায়। তাদের শেখার সেই চাহিদা তৈরি হয় বলেই তারা পড়তে যায়।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি শিক্ষকদের যে বেতন, তাতে একটা সুষ্ঠুভাবে জীবন চালানো কঠিন। এতো স্বল্প আয়ে একটা পরিবার চালানো সম্ভব না। তাদের জন্য সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বা পৃথক কাঠামোতেও যদি মানসম্মত বেতনব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তারাও শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী হবেন, প্রাইভেট পড়ানোর প্রয়োজন থাকবে না।
টাইমস: এমপিও সুবিধার বাইরে থাকা শিক্ষকরা বিনা পয়সাতেও ছাত্র পড়ান। এভাবে কোনো শিক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে?
অধ্যাপক মজিবুর: এটা খুবই অমানবিক বিষয়। তারা আশা করে যে, আপাতত পড়াই। হয়ত পরে সরকার তাদের এমপিওভুক্ত করবে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই প্রথা খুবই অন্যায্য। এসব প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ভালো শিক্ষক ও ভালো শিক্ষার্থী চাইলে, প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ চাইলে, শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
টাইমস: কোনো সরকার কি আসলে শিক্ষার মানে পর্যাপ্ত মনযোগ দিয়েছে?
অধ্যাপক মজিবুর: শিক্ষার মান পরিবর্তন হোক এটা সবাই চাই। এই সরকার এখনো নতুন, ছয় মাস হচ্ছে মাত্র। এখনি আশাহত হতে চাই না। তারা যে শিক্ষার মানোন্নয়নের ব্যাপারে যেসব কথা বলেছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে বাস্তবিক অর্থেই বাংলাদেশের শিক্ষার অবস্থার পরিবর্তন হবে।
তবে সরকার যেসব সিদ্ধান্ত এখন নিচ্ছেন, সেগুলো যথাযথ নীতিমালার আলোকে নিচ্ছেন না। শিক্ষা খাতকে ঠিক করতে হলে শিক্ষার দর্শন আগে ঠিক করতে হবে। শিক্ষা কমিশন থাকতে হয়, শিক্ষার নীতিমালা করতে হয়। এসবের আলোকে তৈরি হয় একটি শিক্ষা কারিকুলাম। এসব বাদ দিয়ে শুধু পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করে শিক্ষা পরিবর্তন হয় না।
সরকার কিছু ক্ষেত্রে তড়িঘরি করে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সরকারকে এই ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নাহলে অতীতের সব সরকারের মতোই আবারও দুষ্টচক্রে পতিত হবে শিক্ষাব্যবস্থা।


