বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৭) মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহভাজন আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে (২৩) আরও তিন দিনের রিমান্ড দিয়েছে আদালত।
এর আগে তাকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার তাকে আদালতে হাজির করে আরও সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাতের আদালত এ আবেদন মঞ্জুর করে শুনানি শেষে দীপের পাঁচ দিনের রিমান্ড দেন।
এদিন দুপুর ২ টা ২৫ মিনিটে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে পুলিশের একটি গাড়িতে ঢাকার আদালতে হাজির করে হাজত খানায় রাখেন তদন্ত কর্মকর্তা।
এসব তথ্য জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন।

আদালতে রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, ‘এই আসামি বলেন, তিনি এবং তার বন্ধুকে (তাহসিফ) কয়েকজন তাড়া করেন। ধাওয়া খেয়ে তারা দৌড় দিলে তাহসিফ নদীতে ঝাপ দেন এবং তিনি (দীপ) পালিয়ে যান। কিন্তু তিনি (দীপ) ওই রাতে কাউকে কোনো কিছু বললেন না। কারও বন্ধু হারিয়ে গেলে কেউ ঠিক থাকতে পারে না। তিনি (দীপ) এখন পর্যন্ত যে তথ্য দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট। তিনি এলোমেলো তথ্য দেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন না, তার পিছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাত আছে কি না তা খুঁজে বের করতে সাত দিনের রিমান্ড প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি এই ঘটনা একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মুতাসিম বিল্লাহ আদালতে উল্লেখ করেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ এমন ভাবে আসামিকে প্রেসার দিচ্ছে, তিনি বাধ্য হয়েই স্বীকার করবেন। আমরা যদি ওই রাতের ফোন কল দেখি, সেখানে দেখতে পাবেন কে কাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছেন। কে লিড দিচ্ছেন, আমরা সব সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পাই। সেই ভিডিও অনলাইনেও ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার (দীপ) শরীরের কি অবস্থা আমরা দেখতে পাই। চার দিন রিমান্ড শেষ করে আসতেই আবার সাত দিন কেন। রাষ্ট্রপক্ষ সবসময় জোর করছে। আমি আজকেও জামিন চাই না, জামিনের প্রার্থনাও করছি না। তার স্বাস্থ্যের অবস্থা দেখেন শুধু।’
এর আগে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দ্বিতীয় দফায় নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটটি কারণ দেখিয়ে দীপকে দ্বিতীয় দফায় সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন।
কারণগুলো হলো- সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই, বারে অবস্থানকালে যোগাযোগ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ, হত্যার রহস্য উদঘাটন, অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, আলামত উদ্ধার, হত্যার উদ্দেশ্য অনুসন্ধান ও হত্যাকাণ্ডের স্থান শনাক্ত।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানিয়েছেন, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি তাহসিফকে তার বাসা থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান। পরে তাহসিফ, দীপ ও মামলার আরেক সন্দিগ্ধ আসামি জেরিকা তাসনিম দিশা (১৯) একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করেন। একপর্যায়ে দিশা বাসায় চলে যান।

দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে তাহসিফ ও তিনি টঙ্গীর মাজার বস্তিতে পৌঁছান। সেখান থেকে বস্তির ভেতর দিয়ে তুরাগ নদীর তীরবর্তী একটি মাঠে যান। পরে মাঠে কয়েকজন লোকজনের উপস্থিতি দেখে তারা আলাদা হয়ে যান বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন দীপ।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। সেগুলো তদন্তের স্বার্থে গোপন রেখে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে তিনি অত্যন্ত কৌশলে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন এবং কিছু বিষয়ে নীরবতা পালন করেছেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ঘটনার আগে তাহসিফকে দীপ ও দিশার সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা এবং রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে দেখা গেছে। তদন্তে এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে সবশেষ ওই দুজনের সঙ্গেই তাহসিফের দেখা হয়েছিল বলে দাবি পুলিশের। এ কারণে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মামলার তদন্ত এখনো চলমান থাকায় দীপকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হলে তিনি পলাতক হয়ে তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন বলেও উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
এর আগে গত ৩১ অক্টোবর থেকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।

এরপর গত রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেনের আদালত তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তার ‘বান্ধবী’ দিশাকে চারদিনের রিমান্ড দেন। রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা ফিরোজ উদ্দিন উল্লেখ করেন, গত ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার একটি বারে তাহসিফের সঙ্গে যান দিশা। সেখানে তারা প্রায় দেড় ঘণ্টা ছিলেন। এ ছাড়া মোটরসাইকেল গ্যারেজসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের একসঙ্গে যাতায়াতের দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের তথ্যও রয়েছে।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাহসিফকে ডেকে নিয়ে বাইরে যান সন্দেহভাজন আসামি দীপ। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পায় পুলিশ। পরে নৌ-পুলিশের সহযোগিতায় মরদেহটি উদ্ধার করা হয় এবং সঙ্গে থাকা হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তাহসিফ সাউরির পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
২৯ অক্টোবর দুপুর আড়াইটার দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের মসজিদে জানাজার নামাজ শেষে রাজধানীর উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাহসিফ সাউরিকে দাফন করা হয়।


