‘তরতাজা ছেলেকে কবরে রেখে কীভাবে থাকব’

‘তরতাজা ছেলেকে কবরে রেখে কীভাবে থাকব’
ছেলেকে হারিয়ে জিহাদের মা শয্যাসায়ী, আর বাবা বাকরুদ্ধ। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বন্ধুদের সঙ্গে কক্সবাজার ঘুরতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ঝিনাইদহের দুই যুবকের বাড়িতে এখনো চলছে আহাজারি। নিহতদের একজন বিজিবির সিপাহী নাইমুর ইসলাম জিহাদ। অন্যজন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নাঈম মিয়া। ছেলেকে হারিয়ে জিহাদের মা শয্যাসায়ী, আর বাবা বাকরুদ্ধ। একই অবস্থা নাঈমের বাড়িতেও। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা।

গত শনিবার লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকায় মারছা পরিবহনের দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। তাদের মধ্যে দুইজনের বাড়ি ঝিনাইদহে।

নিহত জিহাদ সদর উপজেলার বাজারগোপালপুর গ্রামের চাঁন আলীর ছেলে এবং নাঈম একই উপজেলার পোতাহাটি গ্রামের আনোয়ার খন্দকারের ছেলে।

রোববার দুপুরে বিজিবির পক্ষ থেকে জিহাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্যদিকে নাঈমের স্বজনরা লোহাগাড়া থানা পুলিশ থেকে মরদেহ বুঝে নিয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে দাফন করেন।

স্বজনরা জানিয়েছেন, জিহাদ ও নাঈম ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এক বছর আগে জিহাদ বিজিবিতে চাকরি পান। ছুটিতে বাড়ি এসে গত ৪ মে বন্ধুকে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে যান। ফেরার পথে ৯ মে সকাল ১০টার দিকে তাদের বাস দুর্ঘটনায় পড়ে। ঘটনাস্থলে এক নারী নিহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান জিহাদ ও নাঈম।

ছেলের শোকে ভেঙে পড়েছেন জিহাদের মা আমেনা খাতুন। বাড়িতেই চলছে তার চিকিৎসা। বাবা চান আলীও ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না। কৃষক দম্পতির দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে সাড়ে সাত বছর ধরে মালয়েশিয়ায় থাকেন। ছোট ছেলে জিহাদ ২০২৪ সালে এইচএসসি পাস করে বিজিবিতে সিপাহী পদে যোগ দেন। চাকরি পাওয়ার পর মাত্র দুইবার ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। দ্বিতীয়বার এসে বন্ধুর সঙ্গে কক্সবাজারে ঘুরতে গিয়ে ফিরলেন মরদেহ হয়ে।

আরও পড়ুন

সোমবার দুপুরে জিহাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই বছর আগে দুই কক্ষের একটি পাকা ঘর তুলেছিলেন বাবা চাঁন আলী। এখনো প্লাস্টারের কাজ শেষ হয়নি। দুই ছেলের কারও বিয়ে হয়নি। ঘরের এক কোণে চৌকির ওপর শুয়ে আছেন আমেনা খাতুন। শরীরে স্যালাইন চলছে। পাশে বসে ছেলের স্মৃতি মনে করছেন বাবা। প্রতিবেশীরা এসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমেনা খাতুন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার ছেলে কত খুশি মন নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে গেল, আর ফিরল মরদেহ হয়ে। দুই ছেলের একজন বিদেশে থাকে। ছোট ছেলেকে চাকরিতে পাঠিয়ে কত দুশ্চিন্তা করতাম। পরে ভাবতাম, দুইজনই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমার তরতাজা ছেলেকে অন্ধকার কবরে রেখে আমি কীভাবে থাকব?’

বাবা চাঁন আলী টাইমসকে বলেন, ‘আমার বয়স প্রায় ষাট। কষ্ট করে বড় ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। ছোট ছেলে লেখাপড়ায় ভালো ছিল। ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে নিজেই চাকরি নিয়েছিল। কিন্তু আজ আমার সব শেষ হয়ে গেল।’

একই শোকের আবহ পোতাহাটি গ্রামে নাঈম মিয়ার বাড়িতেও। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা গোলাপি খাতুন।

নাঈমের চাচা সাইফুল ইসলাম টাইমসকে জানান, তার ভাই আনোয়ার খন্দকার চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালান। নাঈম ছিল পরিবারের একমাত্র ছেলে। মরদেহ আনতে তিনিই গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘পারিবারিকভাবে দাফন করেছি। কিন্তু ভাই-ভাবিকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছি না।’

এ ঘটনায় বাসের অজ্ঞাত চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad