টালমাটাল পরিস্থিতিতে পড়েছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কমার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না, পরিস্থিতি শান্ত করতে দুই সরকারেরই দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ না নিলে এই অচলাবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মঙ্গলবার ভারতের নয়াদিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে একটি হিন্দু সংগঠনের কর্মীরা বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীরা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কুশপুতুল পোড়ান। এসময় অন্তর্বর্তী সরকারকে হুঁশিয়ার করে নানা স্লোগানও দেন তারা।
এর আগে সোমবার ডানপন্থী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) বিক্ষোভের ডাক দেয়। মুম্বাইয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতা অলোক কুমার ভারতীয় নাগরিক ও সরকারের প্রতি বাংলাদেশবিরোধী সমন্বিত কর্মসূচির আহ্বান জানান। তিনি নয়াদিল্লি, মুম্বাইসহ বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের সামনে বিক্ষোভের কথাও বলেন।
তাছাড়া শনিবার রাতে নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে আরেক দফা বিক্ষোভ হয়। তখন হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ ও তার পরিবার তার ভেতরেই অবস্থান করছিলেন। তাতে কূটনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়।
কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে। ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয় তাকে। সম্প্রতি দ্বিতীয়বারের মতো তলব করা হলো তাকে। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে তাঁকে ডাকা হয়েছিল।
আগের বৈঠকে ভারতে বসে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ নিয়ে উদ্বেগ জানায় ঢাকা। বাংলাদেশের মতে, এসব বক্তব্য আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা।
মঙ্গলবার ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করার প্রতিক্রিয়ায় একই দিন বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করে ভারত।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লিগের যুব শাখার প্রধান কামরান সাঈদ উসমানি মঙ্গলবার এক ভিডিও বার্তায় বলেন, দিল্লি ঢাকার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিলে ইসলামাবাদ তার জবাব দেবে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনে আঘাত আসে বা কেউ যদি বাংলাদেশের দিকে কুদৃষ্টি দেয়, তাহলে মনে রাখতে হবে—পাকিস্তানের জনগণ, সশস্ত্র বাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র দূরে নয়।’
উত্তেজনার তাৎক্ষণিক প্রশমন জরুরি
সাবেক কূটনীতিকেরা সতর্ক করে বলছেন, দুই পক্ষ দ্রুত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
দিল্লিতে দায়িত্ব পালন করা এক সাবেক বাংলাদেশি কূটনীতিক বলেন, দুই প্রতিবেশীর এমন বৈরী আচরণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কূটনীতিতে প্রতিবেশী বদলানো যায় না; উত্তেজনা চলতে থাকলে দুপক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আরেক সাবেক কূটনীতিক বলেন, ভুল–বোঝাবুঝি দূর করতে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ জরুরি। পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিফলন হলেও কূটনীতিকদের অপর পক্ষের উদ্বেগের প্রতি সংবেদনশীল থাকতে হয়।
বিরোধের নানা কারণ
আওয়ামী লীগের শাসনামলে দিল্লির প্রকাশ্য সমর্থনের কারণে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়। বিপরীতে, গত বছর শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব বাড়ে। তা আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভারতীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক কথাবার্তায়।
ভারতের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘু বিষয়টিকে দীর্ঘদিন ধরেই ইস্যু করে তোলা হচ্ছে। মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে আসার পর এ নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়। যদিও বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়েও ভারতীয় কর্মকর্তাদের মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করে ঢাকা। এদিকে, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে বাংলাদেশ ক্রমাগত আপত্তি জানিয়ে আসছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষ্য এখন দুই ধারায় প্রবাহিত- হাসিনাবিরোধী ও ভারতবিরোধী মনোভাব। ভারতেও একই ধারা চলমান। সেখানেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে ‘বাংলাদেশ কার্ড’।
ইউনূস আমলে বাড়তি উত্তেজনা
গত দেড় বছরে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে একের পর এক তলব, মিশনে ভাঙচুর, সড়ক বিক্ষোভ ও তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ভাষার ব্যবহার দেখা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তা উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়।
পরদিন তরুণ রাজনৈতিক নেতা শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। গুজব ছড়ায়, হামলাকারী ভারত পালিয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করা হয়। ১৫ ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য করেন। এরপর ১৭ ডিসেম্বর ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করা হয়।
পরদিন ময়মনসিংহে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য দীপু চন্দ্র দাস নিহত হন। ঘটনাটি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়। এর পরপরই ভিএইচপি ও বজরং দলসহ ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশবিরোধী কর্মসূচি জোরদার করে।
আঞ্চলিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দক্ষিণ এশিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে এ অঞ্চল অস্থিতিশীল হতে পারে। বিশেষ করে পাকিস্তান তখন পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে।
এক সাবেক কূটনীতিক বলেন, এখন প্রয়োজন উভয় পক্ষেরই রাজনৈতিক পরিপক্কতা এবং এমন নেতৃত্ব যারা জনপ্রিয়তাবাদী চাপের ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নেবে। কারণ ভারতবিরোধী বা বাংলাদেশবিরোধী আবেগ বাড়লে তৃতীয় পক্ষের জন্য সুযোগ তৈরি হবে।
আরেক কূটনীতিক ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তার মতে, অস্থিতিশীল বাংলাদেশ ভারতের জন্য ঝুঁকি বাড়ায়। শেখ হাসিনা ভারতের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারে সাড়া দিয়ে অনেক সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৫ বছর ধরে এক কর্তৃত্ববাদী শাসনকে দিল্লির সমর্থন দেওয়ায় অনেক বাংলাদেশি এখন নিজেদের প্রতারিত মনে করেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, উত্তেজনা কমাতে এবং বাংলাদেশের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ রাখতে দুই দেশের রাজনৈতিক পুনঃসংযোগ জরুরি। তা না হলে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে, যা আসন্ন নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করবে।


