ডিমের দাম এত বাড়ছে কেন?

ডিমের দাম এত বাড়ছে কেন?
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

রাজশাহীর পবার বাসিন্দা মোহাম্মদ হাফিজ। ২০১৯ সালে পারিবারিক জমিতে ডিমের খামার শুরু করেন তিনি। তখন মুরগি ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০টি। সাত বছরে শেড বেড়ে হয়েছে চারটি। মুরগির সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪ হাজার। তবে খামারের পরিধি বাড়লেও হাফিজের মুনাফা বাড়েনি।

উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কখনো কখনো লোকসানও হচ্ছে তার। এর সঙ্গে রয়েছে বাজার ব্যবস্থার নানা সমস্যা।

অন্যদিকে ভোক্তাদেরও বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে। ডিমের ডজনের দাম বেড়ে ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ডিমের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আমিষের সস্তা উৎস হিসেবে পরিচিত ডিম দিয়ে ভাজি খেতেও এখন রাস্তার পাশের হোটেল বা রেস্তোরাঁয় ৩০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এতে বিক্রি কমেছে বলে জানিয়েছেন রেস্তোরাঁকর্মীরা।

২০১৯ সালে হাফিজ যখন খামার শুরু করেন, তখন খুচরা বাজারে ডিমের ডজন ছিল ১০০ টাকার নিচে। এখন খাদ্য ও ওষুধের বাড়তি দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছেন না খামারিরা।

হাফিজ শুরু থেকেই খামারের হিসাব লিখে রাখেন। ২০১৯ সালে ডিম উৎপাদনে তার মাসিক খরচ ছিল ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। এখন তা ১০ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে।

সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ওষুধের খরচ। সাত বছরে এই খাতে ব্যয় প্রায় তিন গুণ হয়েছে।

ইনকিউবেটর থেকে বাচ্চা আনার পর ডিম উৎপাদন শুরু হওয়া পর্যন্ত ৫ থেকে ৬টি ভ্যাকসিন দিতে হয়। এর খরচ বহন করা ছোট খামারিদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

১ হাজার মুরগির একটি ব্যাচের হিসাবে, প্রথম দিনেই ভ্যাকসিনে খরচ হয় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। তিন দিন বয়সে খরচ দাঁড়ায় ১২ হাজার টাকা। ১৫ দিন বয়সে আরও ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাগে। ৪৫ দিন বয়সে দিতে হয় আরেকটি ডোজ।

এর বাইরে রয়েছে বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের মজুরি। ১ হাজার মুরগির খামারে আগে দিনে গড়ে ৫৫০ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসত। গত তিন মাসে এই খরচ আরও বেড়েছে।

রাজশাহীর আরেক খামারি আবু ইউসুফের খামারে মুরগি রয়েছে ১ হাজারটি। প্রতিদিন খাবার লাগে আড়াই বস্তা।

তিনি বলেন, ‘দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম ১৫০ টাকা বেড়েছে। কোম্পানির ফিড নিলে বস্তাপ্রতি ৩ হাজার টাকা। স্থানীয় ফিড নিলে ২ হাজার ৫০০ টাকা।’

ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (এফআইএবি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. আহসানুজ্জামান বলেন, ‘কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।’

তার তথ্য অনুযায়ী, দুই মাস আগেও ভুট্টার কেজি ৩০ টাকার মধ্যে ছিল। এখন তা ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা। নভেম্বরের জন্য খোলা এলসিতে দাম ৪০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

ধানের কুড়ার দাম ২৮ থেকে ২৯ টাকা থেকে বেড়ে ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা হয়েছে। ডিওআরবির দাম ২০ থেকে ২৪ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ থেকে ৩৪ টাকা হয়েছে।

আরও পড়ুন

সয়াবিন মিলের দাম দুই মাস আগে ছিল ৫৪ থেকে ৫৫ টাকা। এখন তা ৬৫ টাকা। নতুন এলসিতে দাম ৭০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে জানান আহসানুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘কুড়ার উৎপাদন কমেছে। আবার ভালো মানের কুড়া ও ডিওআরবি রপ্তানি হচ্ছে। ফলে দেশীয় বাজারে সংকট তীব্র। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় বড় খামারি ও মজুতদাররা ভুট্টার দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।’

ফিড উৎপাদনের আনুষঙ্গিক খরচও বেড়েছে। ৫০ কেজির ব্যাগের দাম ২৬ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ টাকা হয়েছে। বেড়েছে পরিবহন খরচও।

ব্যাংকঋণের সুদের হারও বেড়েছে। আহসানুজ্জামান বলেন, ছোট ফিড মিলগুলো কাঁচামাল কিনে টিকতে না পেরে উৎপাদন কমাচ্ছে বা বন্ধ করে দিচ্ছে।

দেশের পোলট্রি খাতের আকারও বেড়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২০ সালে ডিমের বাজারের আকার ছিল প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা দ্বিগুণ হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ডিমের প্রায় ২০ শতাংশ আসে করপোরেট খামার থেকে। বাকি ৮০ শতাংশের জোগান দেন ক্ষুদ্র খামারিরা।

অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন ছিল ১ হাজার ১৭ কোটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ২ হাজার ৪৪০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

এক দশক আগে বছরে মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ছিল ৩৫টি। এখন তা বেড়ে ১৩৭টিতে দাঁড়িয়েছে।

উৎপাদন বাড়লেও ক্ষুদ্র খামারিরা কেন টিকে থাকতে পারছেন না, সে বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘উৎপাদন বৃদ্ধি ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে মূল্যের ব্যবধান বাজারের অদক্ষতাকে প্রতিফলিত করে। পশুখাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন খরচের সঙ্গে কৃষকেরা হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে অস্থিতিশীল বাজারের কারণে ভোক্তাদের চড়া দাম দিতে হচ্ছে। এই সবকিছুর মধ্যে বড় বড় করপোরেশনগুলো বিপুল মুনাফা করছে।’

চট্টগ্রামের খামারি উসমানি ইসলাম জানান, গত বছর বাচ্চার সংকট ও উৎপাদন খরচ বাড়ায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়েছে। বাচ্চার মান খারাপ থাকায় প্রায় ৩০ শতাংশ বাচ্চা মারা গেছে।

তার মতে, উৎপাদন বাড়লেও ছোট খামারিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এটিকে টেকসই উন্নয়ন বলা যাবে না।

গত ১২ সেপ্টেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘পোলট্রি খাতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মান নিশ্চিত করতে হবে। খামারিরা যেন ন্যায্যমূল্য পান, মানুষ যেন সাশ্রয়ী মূল্যে ডিম-মাংস কিনতে পারেন, সেই সমন্বয় করতে হবে।’

অদৃশ্য শৃঙ্খলে খামারির অসহায়ত্ব

ডিম উৎপাদনেরও একটি প্রাকৃতিক চক্র রয়েছে। একটি খামারে মুরগি সাধারণত দুই বছর রাখা হয়। ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময়কে ‘পিক টাইম’ ধরা হয়। এ সময় উৎপাদন ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়।

প্রাকৃতিক চক্র ও উৎপাদন খরচের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাও খামারিদের জন্য বড় সমস্যা। উৎপাদিত ডিম স্বাধীনভাবে বিক্রির সুযোগ অনেক ছোট খামারির নেই।

মোহাম্মদ হাফিজ বলেন, ‘আমরা অনেকটা বন্দি দশায় আছি। আমাকে ডিম একজনের কাছেই বিক্রি করতে হবে। ডিলার নির্দিষ্ট থাকে। তাকেই দিতে হয়। তিনি যে দাম দেবেন, আমাকে সেই দামই নিতে হবে। না হলে ডিম খামারেই পচে যাবে।’

জামালপুরের দশানি এলাকার খামারি মো. তন্ময় জানান, ঢাকার তেজগাঁও আড়ত থেকে মোবাইল মেসেজে ডিমের দাম ১০ টাকা ৮০ পয়সা দেখানো হলেও মাঠে ১০ টাকা ৩০ পয়সাতেও কেউ ডিম কেনেনি।

স্থানীয় বাজারে মূলত দুটি সমিতির প্রভাব রয়েছে। একটি ডিলার অ্যাসোসিয়েশন, অন্যটি পোলট্রি ফিড বা খাবার কোম্পানির সমিতি।

উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে থেকে ডিলাররা দাম নির্ধারণ করেন। তাদের মাধ্যমে ডিম ঢাকার পাইকারি বাজার বা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে যায়।

তবে বাংলাদেশ এগ প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি মির মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনো ডিলারের কাছেই ডিম বিক্রি করতে হবে, এমন পরিস্থিতি এখন নেই। বাজারে অনেক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এসেছে।’

তিনি বলেন, বড় খামারগুলো দিনে ২০ থেকে ৫০ হাজার ডিম উৎপাদন করে। তারা পিকআপে করে সরাসরি বাজারজাত করতে পারে। তবে দিনে ৩ হাজার ৬০০ বা এর কম ডিম উৎপাদন করা ছোট খামারগুলোকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।

বাংলাদেশ এগ প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. তাহির আহমেদ সিদ্দিকীর তথ্য অনুযায়ী, কোভিড মহামারির সময় প্রায় ৩০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ সালে বাচ্চার ঘাটতি, ওষুধ ও খাবারের বাড়তি দামের কারণে কিছু খামার বন্ধ হয়। গত বছরও ২০ থেকে ২৫ শতাংশ খামার বন্ধ হয়েছে।

মির মহিউদ্দিন ডিমের সাম্প্রতিক দাম বাড়ার পেছনে গরমে উৎপাদন কমে যাওয়া ও ট্রাক ভাড়া বৃদ্ধিকে দায়ী করেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘ডিমের দামের কারণে গরিব মানুষের কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সরকারের কার্যকর কোনো বাজার তদারকি চোখে পড়েনি।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad