জামায়াত সংশ্লিষ্টতায় প্রধানমন্ত্রীর সফরে রাষ্ট্রদূত বাদ

জামায়াত সংশ্লিষ্টতায় প্রধানমন্ত্রীর সফরে রাষ্ট্রদূত বাদ
মো. দাউদ আলী। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলীকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফর থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর এই সফর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কোনো সরকার প্রধানের সফরের ঠিক আগেভাগে এ ধরনের পদক্ষেপ একেবারে নজিরবিহীন।

রাষ্ট্রদূতের অনুপস্থিতিতে সফরের প্রস্তুতি সামলানোর জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে। তিনি গত বুধবার জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানেই থাকবেন।

গোয়েন্দা সংস্থার একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়, দাউদ আলী জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত। এর ওপর ভিত্তি করেই ৩১ বছর ধরে দেশসেবা করা এই অভিজ্ঞ কূটনীতিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এ ঘটনা বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের দলীয়করণের পুরোনো ক্ষতকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। জনসেবা ও দেশের স্বার্থের চেয়ে দলীয় রাজনৈতিক বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়ায় রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তা—উভয় পক্ষই এখন সমালোচনার মুখে।

বিভিন্ন সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করা সাবেক আমলারা বলছেন, এই পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক দল ও সরকারি কর্মকর্তা উভয়ই দায়ী। রাজনৈতিক দলগুলো দেশের স্বার্থের কথা না ভেবে প্রশাসনের মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়।

অন্যদিকে, কিছু কর্মকর্তা ভালো পদ বা ক্যারিয়ারে দ্রুত উন্নতির লোভে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। দিন শেষে পুরো দেশকে এর মাশুল গুণতে হয়।

যা ঘটেছিল

গত মে মাসে এক সপ্তাহের সফরে জাপান যান জামায়াতের আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, ছাত্রজীবন থেকেই ওই দলের আদর্শে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে দাউদ আলী সেই সফর আয়োজনে সাহায্য করেছিলেন।

আরও পড়ুন

এরপর রাষ্ট্রদূতকে ১৬ অক্টোবরের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় আসতে বলা হয়। তিনি দেশে ফেরার পর নির্দেশ দেওয়া হয়, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশেই অবস্থান করতে হবে।

সফর শেষ হলে দাউদ আলী বিদায়ী কাজগুলো শেষ করতে টোকিও ফিরবেন। আগামী ২৭ ডিসেম্বর তার অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দাউদ আলীকে জাপানে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়। বলা হয়ে থাকে, তিনি তৎকালীন এক উপদেষ্টার বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এমনকি পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তিনি পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার জন্যও দৌড়ঝাঁপ করেছিলেন।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর সফরের তদারকি করতে পররাষ্ট্র সচিব নজরুল ইসলামকে পাঠানো হয়েছে। সফর শেষে তিনি দেশে ফিরবেন।

গুরুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রীয় সফর থেকে একজন রাষ্ট্রদূতকে এভাবে বাদ দেওয়ার ঘটনায় সরকারি চাকরিতে রাজনৈতিক অভিযোগ কীভাবে দেখা হয় এবং কূটনৈতিক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিষয় কতটা প্রভাব ফেলছে সেই প্রশ্ন উঠেছে।

দুই দিক থেকে ক্ষতি

এই ঘটনার পর আমলাদের মধ্যে এক ধরনের ভয় তৈরি হতে পারে। বার্তাটি স্পষ্ট, বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে সামান্য সন্দেহ হলেও ক্যারিয়ারের বড় ক্ষতি হতে পারে।

তবে বিএনপি সরকার প্রশাসনকে পুরোপুরি নিজেদের মতো করে সাজাতে চাইছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সমালোচকরা সতর্ক করে বলছেন, এমনটা হলে দেশ আবারও সেই পুরোনো চক্রেই আটকে থাকবে, যেখানে নতুন সরকার এসে নিজ দলের পছন্দের লোক বসাতে চায়।

এর ফলে সিভিল সার্ভিসের নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়, প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে এবং সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনও দুর্বল হয়ে পড়ে।

পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তের একটি নেতিবাচক কূটনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সফরেই রাষ্ট্রদূতকে বাইরে রাখা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভুল বার্তা দেয়। অথচ বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ও স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রদূতেরই।

যেকোনো সরকার চাইলেই রাষ্ট্রদূতকে ফেরত আনতে বা বদলি করতে পারে। তবে সাবেক আমলাদের মতে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত খুব সাবধানে, পেশাদারত্বের সঙ্গে এবং নিয়ম মেনে নেওয়া উচিত, যাতে কোনো অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি না হয় যা দেশের স্বার্থ বা কূটনৈতিক ব্যবস্থার সম্মান নষ্ট করে।

ঘটনাটি সরকারের সামনে একটি বড় প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে: কাল্পনিক বা সত্য রাজনৈতিক যোগাযোগের দোহাই না দিয়ে কীভাবে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা যায়।

রাজনীতিবিদদের উচিত নিজেদের সুবিধার্থে আমলাতন্ত্রকে ব্যবহার না করা, আর সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত কোনো দলের হয়ে কাজ না করে রাষ্ট্রের সেবা করা। রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় না রাখলে, ক্ষমতায় যে দলই আসুক না কেন, এই দলীয়করণের খেলা কখনো থামবে না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad