জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ‘ফেসবুক কূটনীতি’ নয়, দরকার পেশাদার কূটনীতি

জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ‘ফেসবুক কূটনীতি’ নয়, দরকার পেশাদার কূটনীতি
Advertisement
Advertisement

গত দুতিন সপ্তাহ যাবত সবাই লক্ষ্য করছে – পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার জন‍্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “ফেসবুক ডিপ্লোমেসি”বা “ফেসবুক কূটনীতি”নামক এক অভিনব ও নতুন ধারা অনুসরণ করছে। বিষয়টি অনেকের কাছেই কিছুটা অস্বস্তিকর। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ও কূটনৈতিক বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে এটি নিয়ে প্রশ্ন উঠা অযৌক্তিক নয়। বিশেষ করে ভারতের মতো বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় একটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল কূটনৈতিক বার্তা, মতপার্থক্য কিংবা নীতিগত অবস্থান যদি ফেসবুক পোস্ট, মন্তব্য কিংবা পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হতে থাকে, তাহলে সেটি অপ্রয়োজনীয় সংশয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং এটি দেশের ও সরকারের বৃহত্তর কূটনৈতিক লক্ষ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত ও লক্ষ‍্যচ‍্যূত করতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অবশ্যই কূটনীতির একটি সহায়ক মাধ্যম। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সরকার, রাষ্ট্রপ্রধান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাস এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কূটনীতিকে সহায়তা করতে পারে – তবে তা কোনোভাবেই চিরাচরিত পেশাদার কূটনীতির বিকল্প হতে পারে না।

কূটনীতির মূল স্তম্ভ হলো সংলাপ, আস্থা, গোপনীয়তা, ধারাবাহিকতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক বার্তা সঠিক মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা। দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে তা প্রথমেই জনসমক্ষে নিয়ে আসার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আলোচনার চেষ্টা করাই প্রচলিত ও কার্যকর পদ্ধতি। জনসমক্ষে একবার কোন বিষয়ে কোনো অবস্থান জানান দেওয়া হলে উভয় পক্ষের জন্যই পরবর্তীতে নমনীয়তা প্রদর্শন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই ফেসবুক কূটনীতি বলা যায় মেগাফোন কূটনীতিরই একটি নতুন সংস্করণ, যেটি মূলত দলটি দেশের মধ্যে দূরত্ব ও অবিশ্বাস আরো বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ‍্যে অনেক সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বিষয় রয়েছে যেগুলো অত‍্যন্ত গভীরভাবে পর্যালোচনা করেই সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে ভারতের সাথে অমিমাংসিত বিষয়সমূহের সাথে অন‍্য দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের তুলনামূলক বিচার করা ঠিক হবে না।

মনে রাখতে হবে ভারত শুধু আমাদের প্রতিবেশী নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির অসংখ্য যোগসূত্র। এসব বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যেমন সম্পর্ক পরিচালনা সম্ভব নয়, তেমনি আবেগ, ক্ষোভ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালিত হতে পারে না।

এসব কিছুর প্রেক্ষাপটেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভারত সফরকে দেখতে হবে।

বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক স্বার্থে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা, পারস্পরিক স্বার্থ ও মতপার্থক্য নিয়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে সরাসরি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনারও এটি বার বার বলছেন। একটি সফল সফর শুধু দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বার্থের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু বন্দী বিনিময় চুক্তির আওতায় বন্দী প্রত‍্যর্পনের মত দাবিতে অনড় থেকে বানিজ‍্য ও গঙ্গা পানি বন্টন চুক্তির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ উপেক্ষা করে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ সম্ভব হবে না। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, ভারত ট্রানশিপমেন্ট ও স্থলবন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করেছে যার মাধ‍্যমে প্রতি বছর আমাদের হাজার-হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে, আমাদের রপ্তানি বানিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন‍্যদিকে এখনও আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের জন‍্য ভারতের উপর নির্ভরশীল। গঙ্গা পানি বন্টন চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে তামাদি হয়ে যাচ্ছে। দেশের, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় এই পানি বন্টন চুক্তি অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের কথা না হয় বাদই দিলাম।

আরও পড়ুন

এসব কারণেই প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এসব কারণেই সফরের আগে আমাদের কূটনৈতিক বার্তাগুলো হওয়া উচিত অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, সমন্বিত ও লক্ষ্যভিত্তিক।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে চলে আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে যে ধরনের “ফেসবুক ডিপ্লোমেসি”আমরা প্রত্যক্ষ করছি, সেটি কি নিছক অদক্ষতা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার ফল? নাকি এর পেছনে এমন কোনো কায়েমি বা স্বার্থান্বেষী মহল সক্রিয় রয়েছে, যারা সরকারের ভারতনীতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কূটনৈতিক উদ্দেশ্যকে দুর্বল বা নস্যাৎ করতে চায়?

এটি প্রতীয়মান যে, কিছু কিছু রাজনৈতিক দলও প্রধানমন্ত্রীর এই সম্ভাব্য সফরের সাথে অনেক শর্ত জুড়ে দিচ্ছে। কিছু পরিচিত ভারতবিরোধী বিশেষজ্ঞরা প্রকাশ‍্যে এই সফরের বিরোধিতা করছে। তাদের এধরনের প্রকাশ‍্য প্রচারণা ও বিরোধিতা দেশ ও জাতির জন্য কতটা মঙ্গলজনক তা বিবেচনার দাবি রাখে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে যখন অসঙ্গতিপূর্ণ বা ক্ষতিকর বার্তা প্রকাশিত হয়, তখন এর উৎস, উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম নেয়।

আমাদের মনে রাখা দরকার পররাষ্ট্রনীতি কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ক্ষেত্র নয়। এটি রাষ্ট্রের নীতি। তাই সরকারের বিভিন্ন অংশ থেকে পরস্পরবিরোধী বার্তা যাওয়া কিংবা এমন কোনো বক্তব্য প্রকাশিত হওয়া, যা সরকারের ঘোষিত কূটনৈতিক লক্ষ্যকে দুর্বল করতে পারে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দেশের স্বার্থ স্বার্থে বাংলাদেশের ভারতনীতি হতে হবে বাংলাদেশের স্বার্থনির্ভর – ভারতপন্থী কিংবা ভারতবিরোধী নয়।

ভারতের সঙ্গে যেখানে আমাদের স্বার্থের মিল রয়েছে, সেখানে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। যেখানে মতপার্থক্য রয়েছে, সেখানে দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে হবে। আবার যেখানে সমস্যা রয়েছে, সেখানে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হবে। দৃঢ়তা ও কূটনীতি পরস্পরের বিপরীত নয়; বরং দক্ষ কূটনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জাতীয় স্বার্থে দৃঢ় থেকেও আলোচনার দরজা খোলা রাখা।

তাই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় পেশাদারিত্ব, ধারাবাহিকতা এবং সমন্বয়। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে ঘিরে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ বাংলাদেশের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের ওপর প্রাধান্য না পায়। সফরের আগে এমন কোনো বক্তব্য বা পদক্ষেপ কাম‍্য নয়, যা অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে কিংবা আলোচনার পরিবেশকে সংকুচিত করে দেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি বা উদ্বেগ নিয়ে কথা বলা যাবে না। অবশ্যই বলতে হবে – প্রয়োজনে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবেই বলতে হবে। কিন্তু কোথায়, কখন এবং কীভাবে বলতে হবে, সেটিই কূটনীতির শিল্প।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এক বিষয় নয়। একটি ফেসবুক পোস্ট হয়তো কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রশংসা বা আলোচনার জন্ম দিতে পারে, কিন্তু একটি ভুল কূটনৈতিক বার্তার প্রভাব দুই দেশের সম্পর্কে অনেক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।

অতএব, আমাদেরকে এই “ফেসবুক কূটনীতি”থেকে বেরিয়ে এসে পেশাদার, প্রাতিষ্ঠানিক এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক কূটনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে কোনো কায়েমি বা স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতায় প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ ভারত সফর যাতে বাধাগ্রস্ত বা লক্ষ্যচ্যুত না হয়। সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন এবং বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ভারতের সঙ্গে একটি মর্যাদাপূর্ণ, বাস্তববাদী ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক এগিয়ে নেবেন এটাই সবার প্রত্যাশা।

পররাষ্ট্রনীতিতে যেমন বন্ধু থাকতে পারে, অংশীদার থাকতে পারে, তেমনি মতপার্থক্যও থাকতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র নির্ধারক হওয়া উচিত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।

(মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad