গাজায় কাজ নেই, আয় নেই, তবু বাঁচার চেষ্টা

গাজায় কাজ নেই, আয় নেই, তবু বাঁচার চেষ্টা
খান ইউনিসের একটি বিতরণকেন্দ্রে দান করা খাবার নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন ফিলিস্তিনিরা। ২০২৬ সালের ২৭ মে। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

সকাল ছয়টায় কাজে যান ইউসুফ আল-রিফি। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, কাজ তখনও শেষ হয় না। ৩২ বছরের এই মানুষটি এখন মধ্য গাজা সিটির একটি রাস্তার পাশে তৈরি অস্থায়ী বেকারিতে কাজ করেন। দিনে ৫০ শেকেল (১৭ ডলার) মজুরি পান। কখনো তারও কম।

যুদ্ধের আগে পূর্ব গাজা সিটিতে বাবা ও ভাইদের সঙ্গে মিলে একটি ছোট বেকারি চালাতেন ইউসুফ। সেটি ছিল পরিবারের আয়ের ভরসা। পারিবারিক বাড়ির সঙ্গে বেকারিটিও যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছে। দুই বছর কোনো আয় ছিল না তার। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে চলতে হয়েছে ধার-দেনা আর অন্যের সহায়তায়। পরে রাস্তার পাশে এই অস্থায়ী বেকারিতে কাজ পান তিনি।

‘বেকারির কাজে আমার আগের অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু যুদ্ধের আগের কাজের সঙ্গে এখনকার কাজের কোনো তুলনাই হয় না’, বলেন ইউসুফ।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেও প্রতিদিন কত টাকা আয় হবে, তা জানেন না তিনি। ময়দা ও রুটির দামের ওঠা-নামা আছে। আবার কখনো এসব পণ্য পাওয়া যায় না। তখন বেকারি বন্ধ থাকে, বন্ধ থাকে ইউসুফের আয়ও। যা পান, তাতে সংসারের সব খরচ মেটানো সম্ভব হয় না। সন্তানদের খাবার জোগাড় করতে কখনো প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করতে হয়েছে তাকে।

‘আমি আমার মুঠোফোন ও আমার স্ত্রীর মুঠোফোন বিক্রি করেছি খাবার ও পানীয় কেনার জন্য। আমার আয় দিয়ে কোনোমতে সন্তানদের খাবারই জোটে’, বলেন তিনি।

নির্মাণসামগ্রীর সংকটের মধ্যে বিকল্প হিসেবে কাদামাটির ইট দিয়ে ঘর তৈরি করছেন ফিলিস্তিনিরা। ২০২৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, নুসেইরাত, গাজা উপত্যকা। ছবি: এপি/ইউএনবি

ইউসুফের এই জীবন বুঝতে সাহায্য করে ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের নতুন প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, কর্মক্ষম বয়সী ফিলিস্তিনিদের ৯০ শতাংশের কোনো কাজ নেই। গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২০২৫ সালে মাথাপিছু উৎপাদনের মূল্য নেমে এসেছে দিনে মাত্র ৫৮ সেন্টে। গাজার অর্থনীতি পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে ৭১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

একসময় যে বেকারিতে ইউসুফের পরিবার আয় করত, সেটি এখন নেই। তার মতো আরও অনেকের কর্মস্থল নেই, ব্যবসা নেই, আগের জীবনে ফেরার সুযোগও নেই।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করছেন ২৪ বছরের ইব্রাহিম আবু আল-এইশ। হিসাববিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করেছেন তিনি। এখন স্থানীয় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক হিসেবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবন থেকে পাথর ও ভেঙে পড়া ছাদ সরান। বুলডোজার যাওয়ার পথ তৈরি করাই তার কাজ।

অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির পর ধ্বংসস্তূপ সরানো, রাস্তা খোলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার বিপদ কমানোর কিছু কাজ শুরু হলে এই পেশায় আসেন ইব্রাহিম। কাজটি কঠিন। কয়েকবার আহতও হয়েছেন। একবার তার এক সহকর্মীর ওপর বাড়ির ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে। গুরুতর আহত হন ওই সহকর্মী।

‘এটি খুব ক্লান্তিকর কাজ। জীবনে কখনো ভাবিনি এমন পেশায় কাজ করব’, বলেন ইব্রাহিম।

আরও পড়ুন

ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভবনটি এখনো বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, খান ইউনিস। ছবি: এএফপি/বাসস

নয়জনের পরিবারের দায়িত্ব তার ওপর। বাবা-মা ও ভাইবোনেরা উত্তর গাজার জাবালিয়ার একটি বাস্তুচ্যুত শিবিরে আছেন। দিনে ৮০ শেকেলের বেশি (২৭ ডলার) আয় করেন না তিনি। এত পরিশ্রমের তুলনায় এই টাকা খুবই সামান্য। পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেও তা যথেষ্ট নয়।

শুধু ইব্রাহিম নন, গাজায় পড়াশোনা শেষ করা অনেক তরুণকেও এখন আগের পেশার বাইরে কাজ করতে হচ্ছে।

রাফাহ থেকে খান ইউনিসে বাস্তুচ্যুত তড়িৎ প্রকৌশলে পড়াশোনা শেষ করা আবদুল্লাহ আল-খাওয়াজা এখন একটি ছোট মসলার দোকানে কাজ করেন। হিসাববিজ্ঞানে পড়াশোনা করা আয়হাম আল-নাজ্জার মিষ্টি ও পানীয় বিক্রি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা মুস্তাফা সাল্লুহ বিক্রি করেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী।

বছরের পর বছর পড়াশোনা করে তারা যে ভবিষ্যৎ ভেবেছিলেন, যুদ্ধের পর তা আর নেই। আবদুল্লাহ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরের পর বছর পরিশ্রম করার পর আমাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর সেই স্বপ্নগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।’

মধ্য গাজার আল-মাগাজি শরণার্থীশিবিরে বিক্রির জন্য ডিজেলের বোতল সাজিয়ে রেখেছেন এক ফিলিস্তিনি বিক্রেতা। ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট। ছবি: এপি/ইউএনবি

কেউ দোকানে কাজ করছেন, কেউ মিষ্টি বিক্রি করছেন, কেউ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী বিক্রি করছেন। তাদের পড়াশোনা আর বর্তমান কাজের মধ্যে দূরত্বটা অনেক। কিন্তু সংসার চালাতে হলে কাজ করতেই হবে।

মধ্য গাজার আজ জাওয়াইদায় কারিমের জীবনও বদলে গেছে। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে গ্রিনহাউসে চাষ করছেন তিনি। টমেটো, শসা, শাকপাতা ও গম চাষ করে পরিবার চালাতেন। কৃষি ছিল তার আয়ের একমাত্র উৎস।

যুদ্ধে তার গ্রিনহাউস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গুলিতে প্লাস্টিকে অসংখ্য ছিদ্র হয়েছে। তারপরও গত দুই বছর সীমিত পরিসরে চাষ চালিয়ে গেছেন কারিম। উৎপাদন খরচ বেড়েছে, বাজারও স্থির নয়। পরিবার চালাতে গিয়ে ঋণ করতে হয়েছে তাকে।

২০২৩ সালের অক্টোবরের পর কৃষিকাজের জন্য প্রথম সংগঠিত সহায়তা পাওয়া ৪০ জন কৃষকের একজন ছিলেন কারিম। কৃষি উপকরণ পাওয়ার পর আবার টমেটো চাষে মন দিতে পেরেছেন। এতে কিছুটা কমেছে তার আর্থিক চাপ।

কৃষকের নিজের আয় নিয়ে চিন্তা আছে, আবার মানুষের খাবারের দাম নিয়েও ভাবেন তিনি।

‘আমি চাই, এক কেজি সবজির দাম এক শেকেল হোক, যাতে গরিব মানুষ খেতে পারে। সবাই যেন খেতে পারে’, বলেন কারিম।

গাজায় ধ্বংসস্তূপ ও অর্থনৈতিক সংকট
বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের তাঁবুর পাশ দিয়ে পানির জেরিকেন বহন করে যাচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা। ২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, আল-মাওয়াসি, খান ইউনিস। ছবি: এপি/ইউএনবি

বাজারে খাবারের দাম বাড়ছে, কাজের নিশ্চয়তা নেই, আয় কম। কারও ব্যবসা ধ্বংস হয়েছে, কারও কর্মস্থল। কেউ আবার নিজের পড়াশোনা বা পুরোনো পেশার সঙ্গে মিল নেই এমন কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।

ইউসুফ সকালে বেকারিতে যান। ইব্রাহিম ধ্বংসস্তূপ সরান। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করা তরুণেরা দোকানে বসেন বা পণ্য বিক্রি করেন। কারিম ক্ষতিগ্রস্ত গ্রিনহাউসে আবার ফসল ফলানোর চেষ্টা করেন।

দিন শেষে সবার হিসাবটা প্রায় একই। হাতে যা আসে, তা দিয়ে পরিবারকে চালাতে হবে। পরের দিন কাজ থাকবে কি না, কত টাকা পাওয়া যাবে, সেই নিশ্চয়তা নেই।

ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের সময় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি এখনো বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, গাজা সিটি। ছবি: এপি/ইউএনবি

গাজার অর্থনীতির ধস তাই শুধু বড় বড় সংখ্যায় বোঝা যায় না। বোঝা যায় ইউসুফের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বেকারিতে, ইব্রাহিমের হাতে লেগে থাকা ধ্বংসস্তূপের ধুলোয়, পড়াশোনা শেষ করা তরুণের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকার ছবিতে, কিংবা কারিমের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রিনহাউসে।

কাজের ধরন বদলে গেছে। অনেকের পুরোনো জীবনও বদলে গেছে। কিন্তু পরিবার চালানোর দায় বদলায়নি।

‘একজন শ্রমিককে জীবিকার জন্য সংগ্রাম করতেই হয়। এটাই আমাদের বাস্তবতা, কঠিন, নির্মম, রক্তে ভেজা এক জীবিকা’, বলেন ইউসুফ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad