গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে পরপর তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় করা বিস্ফোরক মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের বয়স, চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র, গ্রেপ্তারের কারণ ও সময় উল্লেখে অসঙ্গতি পেয়েছে আদালত। পুলিশের নথিতেও ত্রুটি থাকায় সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ্ ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমানকে স্বশরীরে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার বিকালে আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন ওসি শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ্। এর আগে গত বৃহস্পতিবার গাইবান্ধার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত (সুন্দরগঞ্জ)-এর বিচারক পাঁপড়ি বড়ুয়া এ আদেশ দেন। দুই কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিস্ফোরক মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা আনিছুর রহমান (৫২), সুলতান আহম্মেদ (৬৫) ও লিটন মণ্ডলকে (৩৯) আদালতে সোপর্দ করা হলে তাদের বয়স, শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং গ্রেপ্তারের সময় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষ করে সুলতান আহম্মেদ আদালতে তার বয়স ৭২ বছরের বেশি বলে দাবি করেন। তিনি লিভার ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত বলেও জানান। অন্যদিকে লিটন মণ্ডল দাবি করেন, তাকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গ্রেপ্তার করা হলেও পুলিশের ফরওয়ার্ডিংয়ে গ্রেপ্তারের সময় বিকাল সাড়ে ৩টা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে আনিছুর রহমানকে আদালতে হাজির করা হলে চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র দাখিলের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ জানায়।
আদালতের আদেশে বলা হয়, আসামিদের বয়স, গ্রেপ্তারের কারণ ও সময় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। একই সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তার নাম, পদবি, সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ত্রুটি রয়েছে।
এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই না করে কেন আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা জানতে ওসি শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহকে স্বশরীরে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমান দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেছেন কি না, তা জানতে তাকেও আদালতে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
শুনানি শেষে আদালত আসামিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ওসি শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ্ বলেন, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় করা মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক মামলা কিংবা অন্য কোনো অপরাধের মামলায় প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর নজির রয়েছে। এ মামলাতেও তদন্তের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে আসামিদের বয়স, শারীরিক অবস্থা ও গ্রেপ্তারের বিষয় নিয়ে আদালত ব্যাখ্যা চেয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি লিখিত জবাব দেবেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমান বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতের আদেশ পাওয়ার পর তিনি আদালতে উপস্থিত হয়ে লিখিত জবাব দিয়েছেন। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
পুলিশ, মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২০ সেপ্টেম্বর ভোরে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড ও দহবন্দ ইউনিয়নের গোপালচরণ এলাকায় পরপর তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
ভোর ৪টা ২৬ মিনিটে উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবু সোলাইমান সরকার সাজা’র বাড়ির সামনে প্রথম বিস্ফোরণ হয়। দুই মিনিট পর ৪টা ২৮ মিনিটে গোপালচরণ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে এবং ৪টা ৩০ মিনিটে বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশের সড়কে তৃতীয় বিস্ফোরণ ঘটে।
পরপর বিস্ফোরণে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এতে কেউ হতাহত হননি। স্থানীয়দের দাবি, বিস্ফোরণের সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শোনা যায়।
এ ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ থানার এসআই মো. নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ জানায়, মামলায় বিস্ফোরক দ্রব্য ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিভিন্ন ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
মামলার তদন্তে পুলিশ প্রথমে আওয়ামী লীগের শান্তিরাম ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। পরে ২৩ সেপ্টেম্বর বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সুলতান আহম্মেদ এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ড থানাপাড়ার লিটন মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরদিন তাদের বিস্ফোরক মামলার আসামি হিসেবে আদালতে সোপর্দ করা হলে বয়স, চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র ও গ্রেপ্তারের সময় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপরই ওসি ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে স্বশরীরে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।


