ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এখন হরমুজ প্রণালির আইনি লড়াই

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এখন হরমুজ প্রণালির আইনি লড়াই
Advertisement
Advertisement

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ বেশিরভাগ সময় ইরানের গোপন ইউরেনিয়াম কেন্দ্রগুলো খোঁজার ওপর ভিত্তি করে চললেও, এখন তা নাটকীয়ভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ‘চলাচলের অধিকার’ সংক্রান্ত দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে। যা শুরু হয়েছিল রকেট, ড্রোন এবং বিমান হামলার মতো সরাসরি লড়াই দিয়ে, তা এখন রূপ নিয়েছে আইনি দাবি এবং পাল্টা দাবিতে। সামুদ্রিক অধিকারের দাবি পূরণ না হলে আরও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও ওয়াশিংটন এবং তেহরান-উভয় পক্ষই আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের দোহাই দিয়ে নিজেদের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণের চেষ্টা করছে।

প্রবাদ আছে, প্রেম এবং যুদ্ধে সবই বৈধ। কিন্তু হরমুজ প্রণালি তথা পুরো বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে শেষ পর্যন্ত আইনি বিচার-বুদ্ধির পথেই আসতে হবে। এখানকার ঝুঁকি অনেক বেশি, কারণ এই সরু নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বিপুল  পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। যুদ্ধের আগে এখানে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৪০টি বড় জাহাজ চলাচল করত। দীর্ঘ সময় এই পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে ।

বর্তমান অচলাবস্থার সূত্রপাত

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে হরমুজ প্রণালীতে থাকা ইরানি বন্দরগুলোর ওপর সম্পূর্ণ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম থেকে জানানো হয়, অন্য দেশের বন্দরগুলোতে যাওয়ার জন্য জাহাজগুলো এই প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। তবে এই ব্যাখ্যা মূল পরিস্থিতিকে বদলে দেয় না। কারণ এই পদক্ষেপের আসল উদ্দেশ্য হলো ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে তাদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি একটি যুদ্ধের শামিল। ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, এই অবরোধ কার্যকর করতে কোনো সামরিক জাহাজ আসলে তা বর্তমান যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হবে। ইরানের দাবি, এই প্রণালীর যেসব অংশ তাদের জলসীমায় পড়েছে, তার ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যুদ্ধ শেষ করার জন্য তারা যে পাঁচটি শর্ত দিয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো—এই নৌপথ নিয়ন্ত্রণে তাদের কর্তৃত্বের স্বীকৃতি এবং জাহাজ চলাচলের ওপর মাশুল বা টোল আদায়ের অধিকার।

ইরানি আইনপ্রণেতা আলাউদ্দিন বোরুজেরদি জানিয়েছেন, ইরান ইতিমধ্যে কিছু জাহাজের কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত মাশুল নিয়েছে। ট্রাম্প এর কড়া জবাব দিয়ে বলেছেন, যারা এই ধরনের অবৈধ মাশুল দেবে তাদের সমুদ্রে চলাচলের কোনো নিরাপত্তা দেওয়া হবে না। এর ফলে ভারত বা চীনের মতো তৃতীয় পক্ষের জাহাজগুলোকে মার্কিন বাহিনী আটক বা জব্দ করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ যুদ্ধের পরিধিকে বিপজ্জনকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। বড় শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে ওয়াশিংটন হয়তো এই হুমকি কার্যকর করার আগে কিছুটা চিন্তা করবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, সেখানে আশা ছিল ইরান জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেবে। কিন্তু এই শান্তি চুক্তি ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কি না তা নিয়ে বিতর্কের কারণে সব থেমে যায় ।

যুদ্ধ ঘোষণার উপায় হিসেবে অবরোধ

যেকোনো দেশের ওপর অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া মানেই যুদ্ধ ঘোষণা করা। এই ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই প্রকৃতপক্ষে চলাচলের ওপর বাধা তৈরি করেছে। ইরান প্রথমে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এটি শুরু করেছে, আমেরিকা তার পাল্টা জবাব দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া বা সরাসরি কোনো হামলার হুমকি ছাড়া ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানটিই ছিল বেআইনি। সারা বিশ্বের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচল করা খুবই জরুরি। এই নৌপথের সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ৩৯ কিলোমিটার প্রশস্ত, যার ফলে এর বেশিরভাগ অংশই ইরান এবং ওমানের নিজেদের সমুদ্রসীমার মধ্যে পড়ে যায়। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই ১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন এবং সাধারণ আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক চলে আসছে ।

শান্তিপূর্ণ চলাচল বনাম ট্রানজিট প্যাসেজ

এই ধরনের নৌপথ দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে মূলত দুটি নিয়ম আছে। প্রথমটি হলো ‘শান্তিপূর্ণ চলাচল’ বা ইনোসেন্ট প্যাসেজ। এই নিয়ম অনুযায়ী বিদেশি জাহাজগুলো একটি দেশের জলসীমা পার হতে পারবে যদি সেই চলাচল শান্তিপূর্ণ হয় এবং ওই দেশের জন্য ক্ষতিকর না হয়। উপকূলীয় দেশগুলো চাইলে নিরাপত্তার প্রয়োজনে নির্দিষ্ট জায়গায় সাময়িকভাবে এই চলাচল বন্ধ করতে পারে। এই নিয়মে সাবমেরিনগুলোকে পানির ওপর দিয়ে চলতে হয় এবং ওপর দিয়ে বিমান যাওয়ার সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয় নিয়মটি হলো ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’, যা আন্তর্জাতিক চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং এটি বেশি স্বাধীনতা দেয়। এখানে জাহাজ এবং বিমান কোনো রকম দেরি না করেই চলাচল করতে পারে। সাবমেরিনগুলো পানির নিচ দিয়ে যেতে পারে এবং ওপর দিয়ে বিমান চলাচলেরও অনুমতি থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই অধিকার সাধারণত বন্ধ করা যায় না এবং উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো কেবল তখনই বাধা দিতে পারে যদি তাদের ওপর সরাসরি কোনো হামলার হুমকি থাকে।

হরমুজ প্রণালি ভৌগোলিকভাবে এমন একটি পথ যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সাথে যুক্ত করে। সমুদ্র আইনের সময় উপকূলীয় দেশগুলো বড় সমুদ্রসীমা পাওয়ার বিনিময়ে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথগুলোতে ট্রানজিট প্যাসেজের সুবিধা দিতে রাজি হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল দেশগুলোর অধিকার রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখা ।

চুক্তি সই না করার ফলে সমস্যা

একটি বড় সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই এই সমুদ্র আইন চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ট্রানজিট প্যাসেজ নিয়মটি এখন একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়েছে যা সবার জন্যই বাধ্যতামূলক। ১৯৭৯ সাল থেকে আমেরিকা তার ‘নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা’ কর্মসূচির মাধ্যমে এটি পালন করে আসছে।

অন্যদিকে ইরানের যুক্তি হচ্ছে তারা কেবল শান্তিপূর্ণ চলাচলের নিয়মটি মানতে বাধ্য এবং দেশের প্রয়োজনে তারা এটি বন্ধ করতে পারে। ইরান চায় বিদেশি যুদ্ধজাহাজ আসার আগে যেন তাদের জানানো হয়।

বর্তমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান শক্ত করতে এবং মাইন সরানোর প্রস্তুতি নিতে হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। ইরান এই কাজকে উস্কানি হিসেবে মনে করে।

ওমান এই চুক্তিতে সই করলেও তারা তাদের জলসীমার ওপর পূর্ণ অধিকার দাবি করে। তবে তারা যুদ্ধজাহাজের জন্য আগে থেকে অনুমতি নিতে বলে, যা মূলত মূল চুক্তির বিরোধী।

হরমুজ প্রণালি এখন একটি যুদ্ধরত অঞ্চলের পথ

চলমান যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। অধ্যাপক মার্ক ওয়েলারের মতে, ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এই প্রণালীকে একটি “যুদ্ধরত প্রণালীতে” পরিণত করেছে। যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী ইরান এখন আইনত মার্কিন বা ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজকে আক্রমণ করতে পারে। সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজে সরাসরি হামলা নিষেধ হলেও যুদ্ধের পক্ষগুলো শত্রুদেশের বা সন্দেহজনক পণ্য বহনকারী জাহাজ জব্দ করতে পারে।

ইরান শুরুতে প্রণালীটি পুরোপুরি বন্ধ করতে চেয়েছিল, যা জাতিসংঘ প্রত্যাখ্যান করে। পরে তেহরান জানায়, তাদের পদক্ষেপগুলো ছিল কেবল আত্মরক্ষার জন্য। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেন, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের পরিস্থিতি সাধারণ সামুদ্রিক নিয়মগুলোর চেয়ে আলাদা। তবে সংঘাতের মধ্যেও সামরিক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখার নিয়ম বলবৎ থাকে। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য জরুরি তেলবাহী জাহাজগুলো এক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা পাওয়ার কথা।

সমাধানের পথ

এই আইনি বিতর্কগুলো আসলে গভীর কৌশলগত লড়াইকে তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য অবাধে জাহাজ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য জরুরি। অন্যদিকে ইরানের জন্য এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ একটি বড় শক্তির উৎস ও দর কষাকষির মাধ্যম।

চীন, ভারত এবং আরব দেশগুলোও এই উত্তেজনা কমাতে আগ্রহী। যেমন সৌদি আরব এই প্রণালীর ঝামেলার কারণে অন্য কোথাও যেন প্রভাব না পড়ে সেজন্য ওয়াশিংটনকে অবরোধ প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছে।

একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য কেবল চলাচলের অধিকার নয়, বরং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ভবিষ্যতের হামলা থেকে নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনাগুলো এখন থেমে থাকলেও যদি উভয় পক্ষ নমনীয় হয় তবে এটি একটি বড় সমাধানের রাস্তা হতে পারে।

সবশেষে হরমুজ প্রণালীতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল সামরিক শক্তি দেখালে চলবে না। এর জন্য উভয় পক্ষকে উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় চলাচলের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে। এটি করতে ব্যর্থ হলে কেবল এই অঞ্চলে অশান্তি বাড়বে না, বরং বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর জন্যও এটি একটি খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad