টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। এখানকার হাতে বোনা তাঁতের শাড়ি এখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তারই পুরস্কার হিসেবে দেশের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের শাড়ির বুননশিল্পকে বিশ্বের বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো)।
ভারতের লালকেল্লায় মঙ্গলবার বিকালে অনুষ্ঠিত ২০তম ইউনেসকো বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তঃসরকারি কমিটির অধিবেশনে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এই কনভেনশনের আওতায় এটি বাংলাদেশের ষষ্ঠ একক নিবন্ধন। সভায় প্রথমবারের মত সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বিগত চার বছরে এটি দ্বিতীয় নিবন্ধন।
সভায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান এবং ইউনেসকো সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত খন্দকার এম. তালহা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানান, এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য অসামান্য গৌরবের বিষয়। দীর্ঘ দুই শতকের বেশি সময় ধরে টাঙ্গাইলের তাঁতীদের অনবদ্য শিল্পকর্মের বৈশ্বিক স্বীকৃতি এটি। টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের সকল নারীর নিত্য পরিধেয়, যা এই শাড়ি বুনন শিল্পের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
রাষ্ট্রদূত এই অর্জনকে বাংলাদেশের সকল তাঁতী ও নারীদের প্রতি উৎসর্গ করেছেন।
শতাব্দী প্রাচীন এই তাঁতের শাড়ির উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে। বিশেষ ধরনের উৎকৃষ্ট মানের সুতা দিয়ে হাতে বোনা এ শাড়ি যেমন নরম, পড়তে তেমনি আরামদায়ক। আর তাই যে কোনো অনুষ্ঠানেই বাঙালী নারীর প্রথম পছন্দ টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়ি। নিজের জন্য কিংবা প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার জন্য টাঙ্গাইল শাড়ির জুরি নেই।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, টাঙ্গাইল তাঁত শিল্পের প্রসার প্রায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। বসাক সম্প্রদায়ের লোকেরাই টাঙ্গাইলের আদি তাঁতি। মূলত সনাতন ধর্মবলম্বী তাঁতিদের মৌলিক উপাধি হলো বসাক। এরা আসলে দেশান্তরি তাঁতি। ঢাকা ও ধামরাই ছিল যাদের আদি নিবাস। এ শাড়ি বোনার ধরন, রঙ, নকশা সব কিছুই আলাদা। তাঁতের এই শাড়ি তৈরি করতেও বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন।
টাঙ্গাইল শাড়ির ডিজাইনে নতুনত্ব সৃষ্টিতে যাদের অবদান রয়েছে তারা হলেন, বাজিতপুরের আনন্দ মোহন বসাক, সীতানাথ বসাক, চন্ডি গ্রামের নীল কমল বসাক, মনে মন্টু; নলসুন্দা গ্রামের হরেন্দ্র বসাক, পাথরাইল গ্রামের রঘুনাথ বসাক, আনন্দ, গোবিন্দ, সুকুমার বসাক, খুশি মোহন বসাক-এর নাম উল্লেখযোগ্য।
টাঙ্গাইলের বিখ্যাত তাঁত পল্লী পাথরাইল, চন্ডি, বাজিতপুর ও পুটিয়াজানি গ্রামেই এখন ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি তৈরি হয়। এ সব গ্রাম থেকেই সুতি জামদানী, সফ্ট সিল্ক, ধানসিঁড়ি, বালুচরি, গ্যাসসিল্ক, স্বর্ণকাতান, দোতারি, চোষা ও রেশম শাড়ির মত বাহারি ডিজাইনের শাড়ি তৈরি করে সরবরাহ করা হচ্ছে সারাদেশে।
টাঙ্গাইল জেলা শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক বলেন, ‘নববর্ষ, ঈদ ও পূজার সময়ে বছরে টাঙ্গাইলের শাড়ির প্রায় ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। নানা কারণে গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে করোনা মহামারীর সময় থেকে শাড়ির ব্যবসা কমে গেছে। মূলধন, প্রয়োজনীয় উপকরণের সমস্যা, নকশা ও প্রযুক্তিগত সমস্যা, দক্ষতার অভাব, বিপণনসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তাঁতি সম্প্রদায়। টাঙ্গাইলের শাড়ি বুননশিল্পকে বিশ্বের বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে যে স্বীকৃতি দিল ইউনেসকো, তা কাজে লাগিয়ে এ শিল্পকে আমাদের বাঁচাতে হবে।’
জেলা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সভাপতি বেনজীর আহমেদ টিটো বলেন, ‘ইউনেসকোর বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে টাঙ্গাইল শাড়ি স্বীকৃতি পাওয়া কল্পনার বাইরে। এতে করে বিশ্ববাজারে টাঙ্গাইল শাড়ির ব্যবসার আরো প্রসার ঘটবে। আমরা ইতোমধ্যে অনেক ভালো মানের তাঁত কারিগর হারিয়ে ফেলেছি। অনেক শ্রমিক অন্য পেশায় চলে গেছে। এ কারণে শাড়ি বুনন ও নকশায় গুণগতমান ধরে রাখতে অনেক বেগ পেতে হবে অথচ প্রবাসি ও অন্য বিদেশিরা এখন হাতে কাজ করা টাঙ্গাইল শাড়ি খুঁজবে।’
এর আগে, গত ৭ ডিসেম্বর আন্তঃরাষ্ট্রীয় পর্ষদের চলমান ২০তম সভা উদ্বোধন করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শংকর। অনুষ্ঠানে ইউনেস্কোর নবনিযুক্ত মহাপরিচালক খালেদ এল. এনানি উপস্থিত ছিলেন।


