জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ। রায় ঘিরে এ মামলায় গ্রেপ্তার ৬ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে।
মামলাটিতে মোট ৩০ জন আসামি। রায় ঘোষণার সময়ে উপস্থিত থাকতে আদালতে হাজির হয়েছেন আবু সাঈদের ভাই রমজান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২, গত ৫ মার্চ রায় ঘোষণার জন্য ৯ এপ্রিল দিন ধার্য করে। প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ২৭ জানুয়ারি থেকে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। এ মামলায় রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদসহ ৩০ জন আসামি, তাদের মধ্যে সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামসহ ছয়জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। বাকি ২৪ জন এখনো পলাতক।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আবু সাঈদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের চিত্র গোটা বিশ্ব দেখেছিল। জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। এ মামলার তদন্তে সন্দেহাতীতভাবে অকাট্য প্রমাণ পেয়েছি আমরা। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কাঙ্ক্ষিত একটি রায় পাবো বলে আমরা আশা করি। কেননা মামলাটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।
এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, আবদুস সোবহান তরফদার ও শেখ মইনুল করিম। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন পর্বে প্রসিকিউশন আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাইলেও আসামিপক্ষ খালাস দাবি করেছে।
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো, আজিজুর রহমান দুলু, সালাউদ্দিন রিগ্যান ও আবুল হাসান।
গত বছরের ৩০ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। প্রসিকিউশনের দাবি, এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নির্দেশনার ধারাবাহিক ফল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই নির্দেশ প্রথমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যায়, সেখান থেকে পুলিশের আইজিপির মাধ্যমে দেশের সব পুলিশ কমান্ড স্ট্রাকচারে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের দমনে লেথাল উইপন ব্যবহারের সেই নির্দেশের ফলেই রংপুরে আবু সাঈদকে হত্যা করা হয়।
প্রসিকিউশন সূত্র মতে, এই মামলায় সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতন দায়ের নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তৎকালীন আইজিপি এবং রংপুরে দায়িত্বরত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের এই দায়ের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি অক্সিলারি ফোর্স হিসেবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাও তদন্তে উঠে এসেছে।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি পুলিশকে আন্দোলন দমনে উসকানি ও নির্দেশ দিয়েছেন। তারা ক্ষমতার উচ্চ অবস্থানে ছিলেন বলে তাদের বিরুদ্ধেও সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির ভিত্তিতে অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মূল দায় সরকারের। শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারদের।
প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। কারাগারে থাকা আসামিরা হলেন এএসআই আমির হোসেন, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল এবং আনোয়ার পারভেজ। আসামিপক্ষে কোনো সাক্ষী নেই।
আদালত সূত্র জানায়, পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা মামলার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয় গত বছরের ৬ আগস্ট, সেদিন ট্রাইব্যুনাল ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। এর আগে ৩০ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় এবং এরপর ২৭ আগস্ট প্রসিকিউশন সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে। পলাতক আসামিদের পক্ষে ২২ জুলাই রাষ্ট্রীয় খরচে চারজনকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২৪ জুন চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তিনি ছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ। ওইদিন সারা দেশে তিনিসহ অন্তত ছয় জন নিহত হন। সেদিন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এর পথ ধরে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান।


