ক্ষমতার মসনদে বসার দুই মাস পার না হতেই এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিএনপি সরকার। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে টালমাটাল অর্থনীতি, অন্যদিকে রাজপথে বিরোধী দলের হুংকার। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের অনিয়ন্ত্রিত তদ্বির। এই তিন চাপে অস্থির সময় পার করছে সরকার।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে সচিবালয়ের আমলাতন্ত্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে এখন এক ধরনের দমবন্ধ করা পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটে অর্থনীতিতে চাপ
চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরু থেকেই দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তেল সংকটে পেট্রোল পাম্পগুলোতে অস্বাভাবিক লম্বা লাইন হচ্ছে, কোথাও কোথাও মারামারির ঘটনাও ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেট্রোল পাম্পে মোতায়েন হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যেমন বাড়ছে, একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীল অবস্থায় তেল সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে ওঠেছে। তেল সংকটে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক গভীর ও অগভীর নলকূপ, অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে কৃষিকাজে সেচ। একই কারণে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এতে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের দুশ্চিন্তায় নীতিনির্ধারকরা।
এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য এরই মধ্যে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সরকারি অফিসের সময়সীমা এক ঘণ্টা কমানো হয়েছে, খোদ প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গাড়ির জ্বালানি সরবরাহেও কাটছাঁট করা হয়েছে।
একই কারণে মার্কেট-শপিং মল সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ী মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘অপরিহার্য’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
অর্থনীতির সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় পরামর্শ পেতে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছেন। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, স্বল্প মেয়াদে এসব পদক্ষেপে কিছুটা সুফল পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিকল্প জ্বালানি উৎসের ওপর নজর দিতে হবে।
আন্দোলনের হুমকি
অর্থনীতির এই নাজুক পরিস্থিতির মাঝেই রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করে তুলছে বিরোধী দলগুলো। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামীসহ সংসদের বিরোধী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এরই মধ্যে রাজপথে আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছে এসব দল। ক্ষমতাসীন বিএনপি নির্বাচনের আগে সংবিধান সংস্কারের বেশিরভাগ প্রস্তাবে একমত হলেও ক্ষমতায় গিয়ে সেই অবস্থান থেকে পিছিয়ে এসেছে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে তাদের আগের অঙ্গীকার সম্পর্কে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন শুরু করলে তা মোকাবেলা নিয়ে বেশ চাপে আছে বিএনপি। এনিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলেও দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
অন্তহীন তদবির
এই দ্বিমুখী চাপের পাশাপাশি সরকারের ভেতরে কাজ করছে আরেক অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ। সেটি হলো তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মাত্রাতিরিক্ত তদবির। গত দুই মাসে সচিবালয়ের চিত্র আমূল বদলে গেছে। মন্ত্রী এবং সচিবদের কক্ষের বাইরে এখন দলীয় নেতাদের ভিড় বেশি দেখা যাচ্ছে। নিয়োগ, বদলি, ঠিকাদারি কাজ বরাদ্দ কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার দাবিতে এসব নেতা মন্ত্রী ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছেন।
সচিবালয়ের অনেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এসব রাজনৈতিক তদবিরের কারণে স্বাভাবিক দাপ্তরিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। মন্ত্রীরা একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে চিন্তিত, অন্যদিকে নিজ দলের নেতাদের তদবিরও সামলাচ্ছেন।
প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে সরকারি কার্যক্রমের দক্ষতা কমিয়ে দিতে পারে। নীতিনির্ধারণে পেশাদারত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়লে তা সামগ্রিক শাসনব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মন্ত্রী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বিগত ১৭ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে ছিল। অনেক চড়াই-উৎরাই পার করেই নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। স্বাভাবিকভাবেই দলের নেতাকর্মীদের চাওয়া-পাওয়া বাড়ছে। এজন্য কেন্দ্র থেকে তৃণমুল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মন্ত্রণালয় ছাড়াও দলীয় কার্যালয় কিংবা সংসদ সচিবালয়ে নিজেদের কাজের জন্য যাচ্ছেন। একে তদবির বলা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন এই মন্ত্রী।
সামনে চ্যালেঞ্জ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাব্বির আহমেদ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে এখন যুদ্ধ চলছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বে এর প্রভাব পড়েছে। এই যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে সেই ধারণা থেকে সরকারকে জ্বালানি ক্রয় করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি সিন্ডিকেট দমাতে হবে।
অর্থনীতির এমন চাপের সময় বিরোধী দলের রাজপথে আন্দোলন ঠিক নয় বলে মনে করেন সাব্বির আহমেদ। তবে সরকার ইচ্ছে করলে রাজনৈতিক সংকট রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে পারতো বলেও মনে করেন তিনি।
সাব্বির আহমেদ টাইমসকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সংকট সরকারকে দ্রুত সমাধান করতে হবে। কারণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়লে আরো বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন এই শিক্ষক।
তবে প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা তদ্বির সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সরকার পরিচালনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, সামনের দিনগুলোতে এসব চাপ মোকাবিলার দক্ষতার ওপরই নির্ভর করবে সরকারের আগামী দিনের গতিপথ।


