জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করা হবে নাকি পুনর্গঠিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখন সংসদে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা চারটি অধ্যাদেশ আগামী ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল আকারে উত্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরকে ভেঙে দুটি পৃথক সংস্থা করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা এই অধ্যাদেশগুলো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে পেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কর্মকর্তারা।
এনবিআরের ট্যাক্স পলিসি সদস্য মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা বজায় রাখতে অবশ্যই তা সংসদে উত্থাপন করতে হবে। তিনি বলেন, “আগামী সপ্তাহ থেকেই এর প্রস্তুতি শুরু হবে এবং প্রথম অধিবেশনেই বিলগুলো পেশ করা হবে।”
তিনি আরও জানান, প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে এনবিআরকে দুটি সংস্থায় বিভক্ত করা হবে নাকি বর্তমান রূপেই রাখা হবে, তা এখন সংসদ সদস্যরা নির্ধারণ করবেন।
পটভূমি ও প্রস্তাবিত পরিবর্তন
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এবং এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি নতুন বিভাগ— ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ গঠনের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চারটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। সরকারের যুক্তি ছিল, একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে নীতি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলায় জবাবদিহি ও দক্ষতা কমছে। এই দুটি বিভাগ আলাদা করলে স্বচ্ছতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
তবে রাজস্ব প্রশাসনের একটি অংশের তীব্র আপত্তির মুখে এই উদ্যোগটি থমকে যায়। কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি ছিল, প্রস্তাবিত এই কাঠামো প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এমনকি এটি কার্যকর করা ঠেকাতে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা হাইকোর্টে রিট পিটিশনও দায়ের করেছেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা
সংবিধান অনুযায়ী, যেকোনো অধ্যাদেশ একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে উত্থাপন করে অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। তা না হলে অধ্যাদেশের কার্যকারিতা থাকে না। সেই নিয়ম মেনেই ১৩তম সংসদের প্রথম অধিবেশনে পুনর্গঠনসংক্রান্ত বিলগুলো উত্থাপন করা হবে। বর্তমানে এনবিআর কর্মকর্তারা এই খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করছেন। বিল পাস হলে বিদ্যমান এনবিআর কাঠামো বিলুপ্ত হবে এবং নতুন কাঠামো কার্যকর হবে। আর বিল প্রত্যাখ্যাত হলে অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে এবং এনবিআর আগের কাঠামোতেই বহাল থাকবে।
অস্থিরতা ও বর্তমান পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে গত বছরের ১২ মে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথম এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের অধ্যাদেশ জারি করে। এরপরই এনবিআর কর্মকর্তারা আন্দোলনে নামেন। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রস্তাবিত কাঠামোতে প্রশাসন ক্যাডারের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
পরবর্তীতে সরকার অধ্যাদেশটি সংশোধন করে পুনরায় জারি করে এবং এই সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্কসংক্রান্ত আরও তিনটি অধ্যাদেশ জারি করে।
দুই মাসব্যাপী চলা এই আন্দোলনের সময় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দেড় হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি বা পুনঃনিয়োগ দেওয়া হয়। চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ মোট ৩৪ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এছাড়া প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং ২০ জনেরও বেশি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।


