অডিটরদের সহযোগিতায় ভুয়া অডিট রিপোর্ট তৈরি করে শত শত কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগে কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত ২৯টি প্রতিষ্ঠান এই জালিয়াতির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অডিট ফার্মের ২৯ জন অডিটর আর্থিক সুবিধা গ্রহণের বিনিময়ে এসব ভুয়া আর্থিক বিবরণী তৈরি করে দিয়েছেন।
একটি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা প্রথমে এই অনিয়ম শনাক্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে (এফআরসি) জানায়। এনবিআর এবং এফআরসি ইতোমধ্যে অভিযুক্ত অডিটরদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এফআরসি জানিয়েছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এসব অডিটরের পেশাগত লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি তাদের পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।
এফআরসি চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, ২৯ জন অডিটর ও তাদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের তদন্ত চলছে। আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই তদন্ত শেষ হতে পারে। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা করার কথাও জানান তিনি।
অন্যদিকে, ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ বাংলাদেশ (আইসিএবি)-এর সভাপতি এনকেএম মবিন বলেন, তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অডিটরের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাননি। তবে নানা সূত্র থেকে এই অভিযোগের কথা শুনেছেন।
তিনি দাবি করেন, নথিপত্রের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অডিটরদের একার দায়বদ্ধতা থাকা উচিত নয়। কারণ, একজন অডিটরের পক্ষে শতভাগ নথির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোই অডিটরদের কাছে ভুয়া তথ্য সরবরাহ করে। তাই অনিয়মের জন্য উভয় পক্ষকেই দায়ী করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
এনবিআর ইতোমধ্যে তাদের সকল কমিশনারেটকে অডিটর বা অডিট ফার্মের অনিয়ম সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য ও প্রমাণ দুদক এবং এনবিআর-এর গোয়েন্দা সেলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। আর যদি এরই মধ্যে কোনো তদন্ত হয়ে থাকে, সেসব তদন্তের নথি এনবিআর কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে।
যেসব ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন বিবেচনা করে এনবিআর তার নিজস্ব গোয়েন্দা ও তদন্ত সেলের (আইআইসি) মাধ্যমে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ভুয়া অডিট রিপোর্টের মাধ্যমে প্রকৃত আয় গোপন করে কর কমানোর বিষয়টি বর্তমানে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভুয়া অডিটের মাধ্যমে বছরে কত কোটি টাকার কর ফাঁকি দেওয়া হয় এর কোনো সরকারি হিসাব নাই। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এর অর্ধেকই হয়েছে করপোরেট কর ফাঁকি থেকে।
এনবিআর-এর তথ্যমতে, গত অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোম্পানি তাদের ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিয়েছে, যার সাথে অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক কোম্পানিই সঠিক তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়। এ কারণে অডিটররা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে রিপোর্ট তৈরি করতে বাধ্য হন। আর এর ফলে তথ্য জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হয়, যাতে প্রকৃত আয় গোপন করে কর ফাঁকি দেওয়া সহজ হয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই জালিয়াতি শুধু রাজস্বের ক্ষতি নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের সহযোগী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ভুয়া অডিট ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তিনি আর্থিক স্বচ্ছতা ফেরাতে কোম্পানি ব্যবস্থাপনা এবং অডিটর—উভয়কেই আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দেন।
তদন্তাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহ
ভুয়া অডিটের অভিযোগে তদন্তের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্স, গিভেন্সি গ্রুপের ৩টি প্রতিষ্ঠান, এনভয় গ্রুপের ৫টি প্রতিষ্ঠান, হা-মীম-আদনান অ্যাগ্রো কমপ্লেক্স, হা-মীম কর্পোরেশন, এডিসন গ্রুপের ৫টি প্রতিষ্ঠান, থার্মেক্স গ্রুপের ৫টি প্রতিষ্ঠানসহ আরও বেশ কিছু শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।
অভিযুক্ত অডিটর ও ফার্মসমূহ
অভিযোগের প্রাথমিক তালিকায় থাকা অডিটররা হলেন হোসেন ফরহাদ অ্যান্ড কোং-এর আসিফুর রহমান, হুদা হোসেন অ্যান্ড কোং-এর মো. শামসুল করিম চৌধুরী, মার্ক অ্যান্ড কোং-এর মোস্তাইন বিল্লাহ, অরুণ অ্যান্ড কোং-এর অরুণ কুমার কুন্ডু, হুদা অ্যান্ড কোং-এর মো. শামসুল হুদা, আক্তার আব্বাস খান অ্যান্ড কোং-এর মবিন শেখ, এমজেড ইসলাম অ্যান্ড কোং-এর মতিউর রহমান, এমএম ইয়াসিন-এর মো. ইয়াসিন, দেওয়ান নজরুল ইসলাম অ্যান্ড কোং-এর উত্তম কুমার সাহা, জাবেদ মৃধা অ্যান্ড কোং-এর মো. জাবেদ আলী মৃধা, আজাদ আবুল কালাম অ্যান্ড কোং-এর আবুল কালাম আজাদ, এ হান্নান অ্যান্ড কোং-এর হান্নান মোল্লাহ, কেএম হাসান অ্যান্ড কোং-এর হেদায়েত উল্লাহ এবং খান ওয়াহাব শফিকুর রহমান অ্যান্ড কোং-এর মো. তানজিলুর রহমান।
তালিকায় আরও আছেন আর্টিসান-এর মো. হারুন-অর-রশিদ ও আব্দুল মোমেন খান লোহানী, সাহা সজীব কুমার অ্যান্ড কোং-এর মো. শরিফুল ইসলাম, ইমরুল কায়েস অ্যান্ড কোং-এর ইমরুল কায়েস, এসআর ইসলাম অ্যান্ড কোং-এর মোহাম্মদ ওয়াহিদুর রহমান, আহমেদ জাবের অ্যান্ড কোং-এর এম জাবের আলী মুসা, ফারহানা নাসরিন অ্যান্ড কোং-এর ফারহানা নাসরিন এবং মোহাম্মদ আতাউল করিম অ্যান্ড কোং-এর এএমএম আতাউল করিম।


