আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী এবং মিত্র জোটের শরিকদের সঙ্গে আসনের ব্যাপারে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বিএনপি। কেন্দ্র থেকে কড়া নির্দেশনা ছিল, দলের সম্ভাব্য প্রার্থীর আসনে অন্য কেউ যেন মনোনয়নপত্র জমা না দেন। কিন্তু সেই নির্দেশনা অমান্য করেই অনেক আসনে একাধিক বিএনপি নেতা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের কারণে অনেক নেতা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলেন এবং অনেকে ক্ষোভ ও দুঃখ নিয়েই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। কোনো কোনো এলাকায় মনোনয়ন বঞ্চিতদের পক্ষে প্রতিবাদ মিছিলও হয়েছে। হাইকমান্ডের নির্দেশ অমান্য করে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের ওপর দলের শীর্ষ নেতারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল সোমবার। তবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকায় বিএনপি আশা করছে, এই সময়ের মধ্যে শরিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা যাবে। তখনই স্পষ্ট হবে যে ৩০০ আসনের মধ্যে মিত্রদের জন্য কতটি আসন ছেড়েছে বিএনপি।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে দিনাজপুর-৩, বগুড়া-৭ ও ফেনী-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তবে তার অসুস্থতার কথা মাথায় রেখে এই তিনটি আসনেই দলের পক্ষ থেকে বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাড়া আর কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেননি।
বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে জোট থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তবে ঋণখেলাপের কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিলের শঙ্কায় শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মীর শাহে আলম মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রেখেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব ‘খেজুর গাছ’ প্রতীক নিয়ে লড়তে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে দল থেকে মনোনয়ন না পেলেও সেখানে বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, জুনায়েদ আল হাবিবের মনোনয়ন বাতিল হলে রুমিন ফারহানা দলের প্রার্থী হতে পারেন। এমনকি স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী হলেও তাকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া হতে পারে। নেত্রকোনা-৪ আসনে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের পাশাপাশি তার স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবণীও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বাবরের মনোনয়ন বাতিল হলে তার স্ত্রী যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, সেজন্যই এই ব্যবস্থা।
নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে শেষ মুহূর্তে অন্তত ১৫টি আসনে প্রার্থী বদল করেছে বিএনপি। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ঢাকা-১৭ আসনে জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রচার শুরু করা বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে শেষ পর্যন্ত ভোলা-১ আসনে পাঠানো হয়েছে।
ঢাকা-১২ আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জোটের মিত্র বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হককে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মাসুদুজ্জামান অনীহা দেখানোয় সেখানে সাবেক সভাপতি আবুল কালামকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে রাউজান আসনে গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবর্তে গোলাম আকবর খন্দকারকে মনোনয়ন দেওয়ায় এলাকায় তুমুল দ্বন্দ্ব চলছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ আসনে এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদের ছেলের জন্য জায়গা ফাঁকা রাখা হলেও অলি আহমদ অন্য জোটে যাওয়ায় সেখানে জসিমউদ্দিনকে প্রার্থী করেছে বিএনপি। চট্টগ্রাম-৪ আসনে কাজী সালাহউদ্দিনের পরিবর্তে আসলাম চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে সরিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে চট্টগ্রাম-১১ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-১০ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন সাঈদ আল নোমান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে মুশফিকুর রহমানের পাশাপাশি কবীর আহমেদ ভূঁইয়াও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে মিজানুর রহমান সিনহার বদলে আবদুস সালাম আজাদ এবং মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে কামরুজ্জামান রতনের বদলে মহিউদ্দিন আহমেদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ঝিনাইদহ-১ আসনে সদ্য পদত্যাগ করা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানকে প্রার্থী করা হয়েছে। নড়াইল-২ আসনে বিএনপির প্রার্থীর পরিবর্তে জোটের ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে মনোনয়ন দেওয়ায় এলাকায় প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে এবং সেখানেও দলের একজন বিকল্প প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন।
অন্যদিকে, ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণঅধিকার পরিষদ থেকে আসা রাশেদ খানের বিরুদ্ধে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করছেন। সিরাজগঞ্জের ৬টি আসনে বঞ্চিত প্রার্থীরা গণহারে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, যার মধ্যে সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে সর্বোচ্চ ১৩ জন প্রার্থী হয়েছেন। তাদের দাবি, শেষ পর্যন্ত দল মনোনয়ন না দিলে তারা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করবেন।
সার্বিক বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, বিএনপি একটি বড় দল হওয়ায় অনেক যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। এক আসনে একাধিক প্রার্থী হওয়া স্বাভাবিক। তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়ের মধ্যেই আলোচনার মাধ্যমে এই জটিলতা কেটে যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।


