ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী সুরাইয়া কাজী। তার কাছে বায়ু দূষণ এখন একটি দৈনন্দিন যন্ত্রণার নাম। আজিমপুর থেকে বাড্ডা–তার চিরচেনা এই যাতায়াত পথ এখন যেন নিশ্বাস নেওয়ার এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। রাস্তার ধুলো আর বাসের ধোঁয়া তার বুক ভারী করে তোলে।
সুরাইয়া বলেন, ‘বাসে উঠলেই মনে হয় কেউ আমার বুক চেপে ধরেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়াটা এখন আর হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়, এটি আমার প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
সুরাইয়া এবং ঢাকার অনেক বাসিন্দার জন্যই এই বিষাক্ত বাতাস ধীরে ধীরে তাদের স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ওপরের দিকে থাকায় এখানকার বাসিন্দারা এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের মুখে পড়েছেন। দূষিত বাতাসের কারণে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, হার্ট অ্যাটাক এবং আর্থিক বোঝা।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, সূক্ষ্ম ধূলিকণার উপস্থিতির দিক থেকে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত দেশ। এখানে গড় বায়ু মান সূচক ছিল ১৬৭, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে শীতকালে ঢাকা প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকে।
সুরাইয়া এখন সব সময় সাথে ইনহেলার রাখেন। সপ্তাহে কয়েকবার তার নেবুলাইজার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে–এই ভয় তাকে সব সময় দুশ্চিন্তায় রাখে। অন্যদিকে, চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে তার মধ্যবিত্ত পরিবার হিমশিম খাচ্ছে।
সুরাইয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাড়ির সবাই আমাকে নিয়ে চিন্তিত থাকে। যদি এই বাড়তি খরচগুলো না হতো, তবে অন্তত আমি তাদের দুশ্চিন্তার কারণ হতাম না।’
গত ১৮ জানুয়ারি ‘সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর বায়ু দূষণের কারণে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়।
এভারকেয়ার হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ড. কে এফ এম আয়াজ ঢাকার এই স্বাস্থ্য সংকটকে ‘বহুমুখী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, শহরের দূষণ এখন অধূমপায়ীদেরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বর্তমানে সিওপিডি, আইএলডি, ফাইব্রোসিস এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের রোগী বাড়ছে। ধুলোবালি, যানবাহনের ধোঁয়া, কালো ধোঁয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন–এই সবকটি বিষয়ই একে অপরের সাথে জড়িত।
ঢাকার অত্যধিক জনসংখ্যা এবং যানবাহনের তাপ দূষিত বাতাসকে মাটির কাছাকাছি আটকে রাখে। এটি একটি গরম ও ভারী পরিবেশ তৈরি করে, যা ফুসফুসের ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
ড. আয়াজ বলেন, ‘শহরের বর্তমান বাস্তবতায় ব্যক্তিগতভাবে পরিবেশ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। বায়ু মান যখন খুব খারাপ থাকে, তখন বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দেওয়া এবং উন্নত মানের মাস্ক ব্যবহার করাই একমাত্র সুরক্ষা।’
বায়ুদূষণ শুধু ফুসফুসেরই ক্ষতি করে না। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনার প্রতি ছয়টির মধ্যে একটির সঙ্গে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম ধুলিকণার সম্পর্ক ছিল। বাতাসে এই কণার পরিমাণ সামান্য বাড়লেও হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আফজালুর রহমান জানান, শীতকালে বাতাসের গতি কম থাকায় ধুলোবালি ও জ্বালানির অবশিষ্টাংশ বাতাসে জমে থাকে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই সূক্ষ্ম কণার সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুস এবং হার্ট উভয়েই প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং রক্তনালী সংকুচিত হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, দূষিত এলাকায় হৃদরোগের হার অনেক বেশি। উদ্বেগজনক বিষয় হলো ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক এবং আকস্মিক হৃদরোগের সমস্যা বাড়ছে।
ড. রহমান আরও জানান, শ্বাসতন্ত্রের কিছু ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও, হার্ট অ্যাটাকের ফলে হৃদযন্ত্রের যে ক্ষতি হয় তা স্থায়ী।
এর অর্থনৈতিক প্রভাবও অত্যন্ত ভয়াবহ। বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশের ক্ষতির কারণে বাংলাদেশের জিডিপির ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ খরচ হয়ে যায়।
শুধু বায়ু দূষণের কারণেই বছরে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় এক লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৯ থেকে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, বায়ু দূষণজনিত অসুস্থতা একদিকে যেমন মানুষের ব্যক্তিগত চিকিৎসার খরচ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে দেশের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘একজন মানুষ যার ৭০ বছর বাঁচার কথা, তিনি দূষণের কারণে ৪৫ বা ৫০ বছরেই মারা যাচ্ছেন। এতে তার পুরো অর্থনৈতিক অবদান হারিয়ে যাচ্ছে।’ এই ধরনের অকাল মৃত্যু শ্রমবাজারকে দুর্বল করে এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে।
অধ্যাপক হামিদ আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে দূষণজনিত রোগের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বাজেট নেই। সরকারি হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া ভিড়ের কারণে সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছে, যা তাদের আর্থিক অভাবকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা এখন জরুরি। ড. আফজালুর রহমানের মতে, জনসংখ্যার চাপ না কমালে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অধ্যাপক হামিদ শক্তিশালী নীতি প্রণয়ন এবং জনমানসের পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যদি পরিবারের মধ্যে স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া না হয়, তবে রাষ্ট্রও একে গুরুত্ব দেবে না।’ এজন্য স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা শৈশব থেকেই শুরু করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, কিছু দ্রুত পদক্ষেপ বায়ু দূষণ কমাতে সাহায্য করলেও দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নির্ভর করবে মানুষের আচরণ এবং চিন্তাধারার পরিবর্তনের ওপর।
এই সংকট এখন মানুষের ফুসফুসের পাশাপাশি পকেটেও আঘাত করছে। ঢাকার বাতাস যখন বিষাক্ত হয়ে উঠছে, তখন জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে–যা এই দেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।


