শাহীনুর ইসলাম শানু
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সাবেক চেয়ারম্যান এম মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে ইনসাইডার ট্রেডিং ও বাজার কারসাজির অভিযোগে তদন্ত করছে।
তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে ডেল্টা লাইফ ইনস্যুরেন্স, পদ্মা ইসলামি লাইফ ইনস্যুরেন্স, প্রবাটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, এশিয়া ইনস্যুরেন্স এবং ইস্টার্ন ইনস্যুরেন্স–এই পাঁচ কোম্পানিকে ঘিরে মোশাররফ হোসেনের সময় বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত গোপন তথ্য শেয়ার কেনাবেচায় ব্যবহার করা হয়েছিল কি না।
একই সঙ্গে ট্রাস্টি-নিয়ন্ত্রিত প্রভিডেন্ট ফান্ড বা অন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল থেকে বিশেষ সুবিধাজনক তথ্যের ভিত্তিতে লেনদেন করা হয়েছিল কি না, তা-ও যাচাই করা হবে। গত সেপ্টেম্বর বিএসইসি উপপরিচালক মাওদুদ মোমেন, সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মেহেদী হাসান রনি এবং সহকারী পরিচালক নাভিদ হাসান খানকে এ তদন্তের জন্য নিয়োগ দেয়।
আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। নিয়ন্ত্রকের নির্দেশে আরেকটি পৃথক তদন্ত চলছে, যেখানে অভিযোগ রয়েছে যে মোশাররফ এবং তার স্ত্রী জান্নাতুল মাওয়া দুটো কোম্পানি খুলে তাদের সন্দেহজনক প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য শেয়ারবাজারে ৩৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।
কমিশন জানিয়েছে, প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে আসা নথি অনুসারে, আইডিআরএ–তে দায়িত্ব পালনকালে মোশাররফ দুটি কোম্পানি—লাভস অ্যান্ড লাইভ অর্গানিক লিমিটেড এবং গুলশান ভ্যালি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ—গঠন করেন। তিনি দুটিরই ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং তার স্ত্রী ছিলেন পরিচালক।
এসব কোম্পানির নামে চারটি আলাদা তহবিল তৈরি করা হয় এবং চারটি বেনিফিশিয়ারি ওনার (বিও) অ্যাকাউন্ট খোলা হয়।
আইডিআরএ–তে যোগ দেওয়ার পর মোশাররফ এই চার তহবিলের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হন এবং উল্লিখিত পাঁচ তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে মোট ৩২ দশমিক ৯১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়। কাগজে-কলমে থাকা দুই কোম্পানির প্রভিডেন্ট ফান্ডে যে অর্থ জমা ছিল, তার উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া, নিয়ম অনুযায়ী, প্রভিডেন্ট ফান্ড সর্বোচ্চ মোট সম্পদের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারে, যা মানা হয়নি।
প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে শেয়ার বিনিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোশাররফ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ৩৩ কোটি টাকা অনেক, এর অর্ধেকও বিনিয়োগ করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, সেই সময় বাজারে অনেক আইপিও ছিল এবং একই টাকা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।
এসব বিনিয়োগ আইডিআরএ–তে যোগদানের আগেই করা হয়েছিল, বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, তখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান হওয়ার পর তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন এবং তার প্রতিনিধি হয়তো ভুলবশত ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কিনে ফেলেছেন। অন্য চার কোম্পানির শেয়ারের বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারবেন না বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তিনি বেশ কয়েকটি সংস্থাকে তথ্য দিয়েছেন।
জানতে চাইলে বিএসইসি মুখপাত্র ও পরিচালক আবুল কালাম টাইমসকে বলেন, কমিশন বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে এই তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ১৮ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন মোশাররফ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ১৪ দশমিক ৫ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুইটি মামলা করেছে।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিমা ও বিনিয়োগ খাতে ক্যারিয়ার গড়া চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মোশাররফ ২০১৮ সালে আইডিআরএ–তে সদস্য হিসেবে যোগ দেন এবং ২০২০ সালে চেয়ারম্যান হন। ২০২২ সালের জুনে দুদক তার এবং পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব চাইলে তিনি পদত্যাগ করেন।
এর আগে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট দুদককে জানায়, পূর্ববর্তী কয়েক বছরে মোশাররফ, তার পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৪২ কোটি টাকা জমা হয়েছে।


