আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ-শঙ্কা আপাতত কেটে গেছে। বিএনপি ২৩৭টি আসনে তাদের মনোনয়ন ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ট্রেনে উঠে পড়েছে। সারা দেশে এখন জোরে বইছে ভোটের হাওয়া। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা দূর করতে নেপথ্যের কোনো শক্তির পরামর্শেই বিএনপি এবার আগেভাগে মনোনয়ন ঘোষণা করেছে।
দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিএনপি বা এর মত বড় দলগুলো নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরে নিজেদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। সাধারণত এই তালিকা প্রকাশ হয় মনোনয়নপত্র জমাদানের দুই-এক দিন আগে। এবারই সেই ধারাবাহিকতার বিপরীতে গিয়ে তফসিল ঘোসণার সম্ভাব্য সময়ের চেয়ে এক মাসেরও বেশি আগে মনোনয়ন ঘোষণা করেছে বিএনপি। তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এর কোনো কারণ জানানো হয়নি। দলের সিনিয়র নেতারা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় জানান, সাধারণত মনোনয়ন ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় মনোনয়ন বঞ্চিতদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দেয়। আগেভাগে মনোনয়ন ঘোষণা করায় এই ক্ষোভ প্রশমনের পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে। এমন চিন্তা থেকেই এবার বিএনপি অনেকটা আগে মনোনয়ন ঘোষণা করেছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। তাই সময় বেশি নেই। বিএনপিতে একাধিক যোগ্য প্রার্থী আছেন। তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে, জরিপ করা হয়েছে। এরপর প্রত্যাশী প্রার্থীদের মধ্যে থেকে একজনকে প্রাথমিকভাবে চুড়ান্ত করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে আবার প্রার্থীদের সাক্ষাৎ নেয়ার পর ফাইনাল করা হবে। তখনই হবে চুড়ান্ত প্রার্থী।’
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, মূলত নির্বাচন পিছিয়ে দিতে সরকার বা অন্য কোনো শক্তির ভিন্ন কোনো পরিকল্পনা ঠেকাতেই বিএনপি এবার আগেভাগে মনোনয়ন ঘোষণা করেছে। এটি বিএনপির নিজস্ব চিন্তা থেকে আসেনি, বরং নেপথ্যের কোনো শক্তি তাদেরকে এই পরামর্শ দিয়েছে।
গত ২ নভেম্বর নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঢাকার এক অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যোগ দিয়ে বলেছিলেন, জনগণের মাঝে এমন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকটা হতাশা প্রকাশ করেই তিনি বলেছিলেন, ‘এমন তো হবার কথা ছিল না।’ তার এমন বক্তব্য নির্বাচন নিয়ে সন্দেহকে আরও জোরদার করে তোলে।
তারেক রহমানের এই বক্তব্যের আগে থেকেই জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করার চেষ্টা করে আসছে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল। তাদের এই আন্দোলনকে অনেকেই নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করছিলেন। রাজনৈতিক মহলেও গুঞ্জন ছিল, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ ও গণভোটের সময় নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে। আর সেই জটিলতার অজুহাতে সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দিতে পারে।
নির্বাচন নিয়ে তারেক রহমানের শঙ্কা প্রকাশের আগের দিন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেন তিন বাহিনীর প্রধান। আগামী সংসদ নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে তারা কথা বলেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সেই সাক্ষাতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের উপর জোর দেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এ সময় তিনি জুলাই সনদ বা গণভোট নিয়ে কোনোরকম জটিলতা হোক-সেনাবাহিনী তা চায় না বলেও প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়ে দেন।
তিন বাহিনীর প্রধানদের এই সাক্ষাৎকারের মূল বার্তা বিএনপির কাছেও পৌঁছানো হয়। এ সময় বিএনপিকে তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করারও পরামর্শ দেওয়া হয়। বলা হয়, বিএনপির মত বড় দল প্রার্থী ঘোষণা করে দিলেই সারা দেশে নির্বাচনের উৎসব শুরু হয়ে যাবে। আর বিএনপির সঙ্গে সঙ্গে অন্যদলগুলোও নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তে বাধ্য হবে। তেমন পরিস্থিতিতে অন্য কোনো শক্তি নির্বাচন পেছানোর মতো ষড়যন্ত্র করার সুযোগ বা সাহস পাবে না।
নেপথ্যের এই পরামর্শ থেকেই বিএনপি এবার অনেক আগেভাগে মনোনয়ন ঘোষণা করেছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। পাশাপাশি জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে এখনো জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনকে শুধুই মাঠের রাজনীতি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জনগণের কাছে নিজেদেরকে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো বড় দল হিসেবে দেখাতেই জামায়াত এখন গণভোট নিয়ে আন্দোলন করছে।


