বিশ্বের অন্যতম যানজটের শহর ঢাকা। এ শহরে প্রতিনিয়ত যানজটে পড়ে কর্মঘণ্টা নষ্ট করেন পথচারীরা। এ শহরের পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা এলোমেলো। শহরটির ট্রাফিক সিগন্যাল সাজসজ্জার চেয়ে বেশি কিছু নয়। আর এই বিশৃঙ্খলার ভেতর জন্ম নিয়েছে এক ‘সুপারহিরো হ্যান্ডম্যান’। এই হ্যান্ডম্যানের কোনো ক্যাপ নেই, নেই কোনো গ্যাজেট। অস্ত্র শুধু একটি ‘তোলা হাত’।
রাস্তার উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা বাস, সিএনজি, মোটরবাইক–সবকিছুর মাঝেই দাঁড়িয়ে যান কিছু মানুষ। হাত তুলে ইশারা দিয়ে থামিয়ে দেন দ্রুতগামী যানবাহনের বহর। আশ্চর্যজনকভাবে, কাজও করে এই ‘হ্যান্ডম্যান’ পদ্ধতি। মুহূর্তের জন্য ঢাকার ট্রাফিক থেমে যায় এই এক হাতের সামনে।
এর আড়ালে আছে এক নির্মম সত্য। ট্রান্সপোর্টেশন রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল ডকুমেন্টেশনের (টিআরআইডি) ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার মাত্র ৩০ শতাংশ ইন্টারসেকশনে ছিল জেব্রা ক্রসিং। যেগুলো এতটাই ফিকে হয়ে গেছে যে অনেকেই তুলনা করেন প্রাচীন গুহাচিত্রের সঙ্গে। আর ৬১-৬৫ শতাংশ ইন্টারসেকশনে ছিল সিগন্যাল বাতি, কিন্তু অধিকাংশই বিকল। এর ফলাফল ভয়াবহ। শুধু ২০২২ সালেই দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৯ হাজার ৯৫১ জন, আহত হয়েছে আরও ১২ হাজারের বেশি মানুষ। ২০২৩ সালেও মৃত্যু ছিল প্রায় ৮ হাজার। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী পথচারী।

কাছেই ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও ঝুঁকি নিয়েই ব্যস্ত রাস্তায় পার হচ্ছেন অফিসগামী থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী সবাই। এক তরুণ পথচারীকে রাস্তা পারাপারের সময় জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজ পার হতে তার কষ্ট হয়ে যায়।’
পাশে থাকা এক অফিসের সিকিউরিটি গার্ড, যিনি প্রতিদিন এমন দৃশ্যের সাক্ষী। তিনি বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে হাত তুলে গাড়ি থামিয়ে পারাপারের কারণে প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটে। মানুষকে বললেও তারা সচেতন হয় না।’
আরেকজন পথচারী বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজটা টার্নিং জায়গায় হওয়ায় সবার পক্ষে সবসময় ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। কারও শারীরিক অসুবিধা থাকলে আরও কঠিন হয়ে যায়।’
পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন পথচারী জানান, মানুষ এখন অলস হয়ে গেছে। সময় বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হন।

তাহলে মানুষ কেন সিস্টেমের ওপর নির্ভর না করে ‘হ্যান্ডম্যান’ হয়ে ওঠে? উত্তর সহজ–কারণ সিস্টেম কার্যকর নয়। ওভারব্রিজ আছে, কিন্তু তা সুবিধাজনক নয়। সিগন্যাল আছে, কিন্তু কাজ করে না। নিয়ম মেনে রাস্তা পার হতে সময় লাগে ১০-১৫ মিনিট, কিন্তু ‘হ্যান্ডম্যান’ হলে লাগে মাত্র ৫০-৬০ সেকেন্ড।
ফুটওভার ব্রিজ ধরে পার হওয়া একজন পথচারী বলেন, ‘এটা মানুষের কমনসেন্স। যতদিন মানুষের মধ্যে এই বোধ না আসবে, ততদিন এমন চলতে থাকবে।’
একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তার চোখে দেখা প্রায় একশ থেকে দেড়শ দুর্ঘটনা ঘটেছে। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য যে বেশি, সেটা যদি মানুষ খেয়াল রাখত, তাহলে এমন হতো না।
ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারকারী আরেকজন ষাটোর্ধ্ব পথচারী বলেন, ‘দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় তিনি সবসময় ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করেন। কিন্তু এটা বয়স্কদের জন্য ব্যরহার করা বেশ কঠিন।’

এত ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও মানুষ কেন ঝুঁকি নিয়ে মানুষ রাস্তা পার হচ্ছেন, প্রশ্ন থেকেই যায়। ঢাকার রাস্তা কি একদিন এমন হবে, যেখানে পথচারীদের বাঁচতে সুপারহিরো হতে হবে না? হয়তো হবে। ততদিন পর্যন্ত হ্যান্ডম্যানই থাকবেন আমাদের অঘোষিত, অপ্রশিক্ষিত আর ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ ‘ট্রাফিক হিরো’। এক হাত তুলে স্যালুট করবেন বাসকে! আর ভাগ্যের ওপর ভরসা করবেন প্রতিদিন।
এ বিষয়ে নর্থ ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার সুফিয়ান আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘যখন সিগন্যালে গাড়ি পার হওয়ার কথা, তখন মানুষ হাত তুলে গাড়ি থামিয়ে পার হচ্ছেন। এখানে জনগণের মোটিভেশন থাকা দরকার। আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু মোটিভেশন যদি না আসে, হাজারো মানুষকে আইন প্রয়োগ করে ম্যানেজ করা কঠিন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যদি জাপান বা উন্নত দেশে যান, সেখানে যখন পথচারীদের জন্য সবুজ সিগন্যাল থাকে তখনই তারা পার হন। গাড়ির জন্য সবুজ সিগন্যাল জ্বললে পথচারী পার হন না। কারণ, তারা মোটিভেটেড।’
‘এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুল-কলেজেও আলাদা পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মোটিভেটেড হন। হাজার হাজার মানুষকে আইন প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এজন্যই মোটিভেশন জরুরি’, যোগ করেন ট্রাফিক পুলিশের এই কর্মকর্তা।


