রংপুরে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে খুনের ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে ধোঁয়াশায় পুলিশ। এটি পরিকল্পিত খুন, নাকি চুরি করতে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্ত কর্মকর্তারা।
ইয়াবা সেবনের বিষয়টি দেখে ফেলায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস চারজনকে হত্যা করেছেন বলে মহানগর পুলিশ কমিশনার জানান। পরে আদালতের জবানবন্দিতেও গ্রেপ্তার দুজন একই বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে শুরু থেকেই এই ভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যার কারণ হিসেবে শুধু এই বক্তব্যের ওপর নির্ভর করছে না তদন্ত।
পুলিশের একাধিক দল হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে দিয়ে অন্য কেউ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কি না এবং হত্যার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
পুলিশ আরও জানতে পেরেছে গণপতি চক্রবর্তীর ব্যাংকে একটি স্থায়ী আমানত ছিল এবং ১৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকার সেই আমানত ভাঙানোর কথা ছিল। তবে সেই টাকা তুলতে পারেননি।
পুলিশ জানায়, টাকা তোলার পরিকল্পনার বিষয়টি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আগে থেকেই জানতেন কিনা। যদি জেনে থাকেন এবং টাকা তুলেছেন, এই ধারণা থেকে তাদের খুন করে বাসায় টাকা খুঁজে না পেয়ে বাসা তছনছ করেছেন কিনা, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় অনেকের দাবি, চারজনকে খুন করার সময় চিৎকারের বিষয়টি সিদ্ধার্থের বাবা-মাসহ প্রতিবেশীরা অনেকেই শুনেছেন। তবে এখন সেখানকার কেউই মুখ খুলছেন না। এমনকি নিহত গণপতির উত্তর পাশের এক প্রতিবেশী খুনের সময় চিৎকার চেঁচামেচি শুনেছেন, এমন কথা বলার পর তাকে মারধর করেছেন তার স্বামী। এরপর তিনিও এ নিয়ে আর কথা বলছেন না।
গণপতি চক্রবর্তীর প্রতিবেশী এবং গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামির পরিবার আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। তারা কেউ মুখ না খোলায় পুলিশ ও গোয়েন্দারা বিভ্রান্তিতে আছেন।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) তিন সদস্যের একটি দল সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এই দলে আছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলী, উপপরিদর্শক মমিনুল ইসলাম ও আবু সাঈদ বাবলা। দুই আসামিকে বুধবার আবার তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
মঙ্গলবারের জিজ্ঞাসাবাদে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে কি না, এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি পুলিশ। তবে মহানগর পুলিশের উপকমিশনার তোফায়েল আহমেদ বলেন, পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করছে পুলিশ।
একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনার দিন গত ২০ আগস্ট দুপুর ১ টা ৪৩ মিনিট থেকে ২২ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ৩ মিনিট পর্যন্ত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ফোনে ৫১ বার কথা বলেছেন।
ঘটনার দিন রাতে, গণমাধ্যমকে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী বলেছিলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ডাকাতি বা বড় ধরনের চুরির উদ্দেশ্য ছিল খুনিদের। ঘটনাস্থল থেকে ৩৪ ধরনের আলামত উদ্ধারের কথাও জানায় তারা।
এক সোর্স পুলিশকে জানায়, গ্রেপ্তারের সময় সিদ্ধার্থের শরীরের নখের আঁচড়ের অসংখ্য দাগ ছিল। সেই তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের দুজনকে আটক করা হয়। পরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে মুখোমুখি করার পর তারা দায় স্বীকার করেন। সিদ্ধার্থের চাচার বাড়ির পেছনে বালু খুঁড়ে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণালঙ্কারও তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতেই উদ্ধার করে ডিবির সদস্যরা।
রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র (মিডিয়া) সনাতন চক্রবর্তী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা সঠিক পথেই আছি। তদন্ত সঠিক পথেই চলছে। অনেক তথ্য-প্রমাণ আমাদের কাছে সুরক্ষিত আছে। মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় আদালতে সেগুলো দাখিল করা হবে।’
অনেক তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সাক্ষীদের বয়ান নেওয়া হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হলে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’
যদি ইন্ধনদাতা হিসেবে কারও নাম আসে, তিনি যেই হোন না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা।
আরও পড়ুন>>>
ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যার শিকার একই পরিবারের ৪ সদস্য
রংপুরে ৪ খুন: আদালতে ২ আসামির স্বীকারোক্তি
রংপুর হত্যাকাণ্ড: দুই আসামির মাদকাসক্তির প্রমাণ মেলেনি


