যশোরের চৌগাছায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গ্রেপ্তারের পর ‘বন্দুকযুদ্ধ’ সাজিয়ে তাদের পায়ে গুলি করার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দিয়েছেন চৌগাছা থানার তৎকালীন এএসআই সিরাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘যে সময় দুই নেতাকে গুলি করার ঘটনা দেখানো হয়েছে, আমি তখন বাসায় ছিলাম। অথচ পরে করা মামলায় আমাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত এবং আহত ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হয়।’
মঙ্গলবার জবানবন্দিতে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত যশোরের চৌগাছা থানায় কর্মরত ছিলাম।’
জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য তিনি, এসআই মুখলেছুজ জামান, এসআই আকিক, এএসআই মাজেদ ও সঙ্গীয় ফোর্সসহ চৌগাছা থানার নারায়ণপুরের একটি ফাঁকা রাস্তায় চেকপোস্ট বসান।
একটি মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ব্যক্তিকে তারা থামান। তাদের সঙ্গে থাকা একটি শপিং ব্যাগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের চাঁদা আদায়ের রশিদ ও রেজিস্ট্রার পাওয়া যায় বলে জবানবন্দিতে জানান সিরাজুল ইসলাম। জিজ্ঞাসাবাদে ওই দুই ব্যক্তি নিজেদের ইসরাফিল ও রুহুল আমিন বলে পরিচয় দেন।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, এসআই মুখলেছুজ জামান মোবাইল ফোনে চৌগাছা থানার ওসিকে বিষয়টি জানান। ওসি তাদের নিয়ে থানায় আসতে বলেন। পরে এক ব্যক্তিকে এসআই মুখলেছুজ জামানের মোটরসাইকেলে এবং অপর ব্যক্তিকে এএসআই মাজেদের মোটরসাইকেলে নেওয়া হয়। তাদের মোটরসাইকেলও পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে থানায় নেওয়া হয়।
থানায় পৌঁছে দুই ব্যক্তিকে ডিউটি অফিসারের কক্ষে রেখে তিনি বাসায় চলে যান বলে জানান সিরাজুল ইসলাম। তার ভাষ্য, তিনি থানা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
পরদিন, ৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে তিনি থানায় যান। ডিউটি অফিসারের কক্ষে ডিউটির তালিকায় নিজের কোনো দায়িত্ব না থাকায় কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার বাসায় চলে যান।
৫ আগস্ট সকালে থানায় ফিরে তিনি জানতে পারেন, আগের দিন রাতে ওই দুই ব্যক্তিকে চৌগাছা থানার বন্দুলিতলা এলাকায় নিয়ে তাদের পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জবানবন্দিতে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ওই গুলিগুলো করে কনস্টেবল সাজ্জাদ এবং জহিরুল।
মামলাগুলো এসআই মুখলেছুজ জামান বাদী হয়ে দায়ের করেন বলে জানান তিনি। ওই মামলায় সিরাজুল ইসলামকে সঙ্গীয় কর্মকর্তা হিসেবে আহত দেখানো হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল, তিনি চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন।
কিন্তু তিনি বলেন, ওই ঘটনায় আমি আদৌ আহত হইনি। ওই মামলায় প্রদর্শিত ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।
বিষয়টি নিয়ে এসআই মুখলেছুজ জামানের সঙ্গে কথা বলার কথাও জানান তিনি। সিরাজুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখলেছুজ জামান তাকে বলেন, এসপি আনিসুর রহমান এবং ওসি মশিউর রহমান সব বিষয়ে অবগত আছেন এবং তাকে নীরব থাকতে হবে।
পরে এসআই জামাল তাকে ওই মামলার সাক্ষী হিসেবে দেখিয়ে চার্জশিট দাখিল করেন বলে জবানবন্দিতে জানান সিরাজুল ইসলাম। তবে তার দাবি, এসআই জামাল কখনো তাকে ওই মামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি।
ঘটনার সঙ্গে তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমান, এসআই মুখলেছুজ জামান, এসআই আকিক, কনস্টেবল সাজ্জাদ ও জহিরুল জড়িত থাকতে পারেন বলে মনে করেন সিরাজুল ইসলাম।
নিজের জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, চৌগাছা থানায় কর্মরত থাকার সময় যশোর জেলায় প্রায় অর্ধশত তরুণকে তৎকালীন সরকারের বিরোধিতা করার কারণে একইভাবে পঙ্গু করা হয়েছিল বলে তিনি জানতে পেরেছিলেন।
এরূপ করা হয়েছিল যেন, অন্যরা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে না সাহস পায়, বলেন তিনি।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিবেকের তাড়নায় আজ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিলাম।
তার অভিযোগ, তৎকালীন সরকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে তাদের দিয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের গুলি করে পঙ্গু করেছে। ভবিষ্যতে পুলিশকে ব্যবহার করে যেন এ ধরনের ঘটনা ঘটানো না যায়, সে জন্য তিনি অপরাধীদের শাস্তি চান বলে জানান।
এর আগে ২০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলায় অভিযোগ গঠন করে। মামলায় যশোরের সাবেক পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানসহ আটজন আসামি রয়েছেন। চৌগাছা থানা পুলিশের তৎকালীন উপপরিদর্শক আতিকুল ইসলাম, তৎকালীন কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহিরুল হক গ্রেপ্তার হয়েছেন। অভিযোগ গঠন উপলক্ষে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চান।
প্রসিকিউশনের দাবি, ২০১৬ সালে চৌগাছা উপজেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন ও সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের পায়ে গুলি করা হয়। পরে গুলির ক্ষতস্থানে বালু ঢুকিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
বালু ঢোকানোর কারণে পায়ে পচন ধরে এবং একপর্যায়ে তাদের দুজনেরই পা কেটে ফেলতে হয়। বর্তমানে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে প্রসিকিউশনের দাবি।
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, ২০১৬ সালে চৌগাছা থানা এলাকায় মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় পুলিশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ওই দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেয়। পরে তাদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে পরিচয় জানার পর একটি চুক্তি হয়। সেই অনুযায়ী তাদের আদালতে হাজির করার কথা ছিল।
কিন্তু আগের রাতে তাদের চোখ বেঁধে অন্য স্থানে নিয়ে দুই হাঁটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয় বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগ। পরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ গুলি হয়েছে উল্লেখ করে তাদের আদালতে হাজির করা হয় এবং শুনানি শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য, দুই শিবির নেতাকে গুলি করার ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। ওই সময় বিরোধী রাজনৈতিক মতাবলম্বীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের হাঁটু, হাত কিংবা শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি করে বিকলাঙ্গ করা হতো। এ ধরনের ঘটনা বিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিপীড়নের অংশ ছিল বলে প্রসিকিউশনের দাবি। চৌগাছার ঘটনাটিও সেই প্রেক্ষাপটে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের পক্ষে আদালতে ছিলেন প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার পালোয়ান।


