নতুন বেতনকাঠামোকে স্বাগত জানিয়ে সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাব প্রতি বছর হালনাগাদ করা এবং তা প্রকাশের বাধ্যবাধকতার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এই দাবি জানায়।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘যেসব কর্মজীবী তাদের আয়-ব্যয় ও সম্পদবিবরণী প্রতি বছর হালনাগাদ করাসহ প্রকাশ করবেন, কেবল তাদের জন্যই নতুন বেতন-ভাতা বৃদ্ধি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। যারা প্রকাশ করবেন না, তাদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রযোজ্য হওয়া অনুচিত।’
এই শর্ত বাস্তবায়িত হলে সরকারি খাতে দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত সেবার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সহজ হবে বলেও তিনি মনে করেন।
কার্যকর জবাবদিহির উপায় নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে নতুন বেতনস্কেল প্রয়োগ করা হলে, সরকারিখাতে দুর্নীতির মাত্রা আরও বাড়বে বলেও আশঙ্কা করছে টিআইবি। তাদের মতে, এই দৃষ্টান্ত আগেও স্থাপিত হয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, অনেক সরকারি কর্মজীবী আছেন যারা অনিয়ম ও দুর্নীতির উর্ধ্বে থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন ও সৎভাবে জীবন যাপন করেন। তাদের জন্য এই নতুন বেতন স্কেল সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত ও অপরিহার্য। অন্যদিকে, যারা অসৎভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ-সম্পদ অর্জনে লিপ্ত, তাদের জন্য এই সুবিধা যেমন অযৌক্তিক, তেমনই সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন।’
নতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি, দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সরকার যে আশার কথা বলেছে, সেটি নিয়েও প্রতিক্রিয়া দিয়েছে টিআইবি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘২০১৫ সালে বাস্তবায়িত অষ্টম পে-স্কেলের ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যে একই আশাবাদ ছিল, কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিপরীতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের ব্যাপকতা ও গভীরতা বেড়েছে অধিকতর হারে।’
এবার তার ব্যতিক্রম হবে-এই বিশ্বাস করতে চান তিনি। বলেন, ‘এক্ষেত্রে সরকারি খাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক চর্চায় পরীক্ষিত পদ্ধতি হিসেবে সম্পদবিবরণী প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা না হলে, সরকারি খাতে দুর্নীতির দুষ্টচক্র থেকে জনগণের পরিত্রাণের উপায় নেই। অথচ দুর্নীতির ভুক্তভোগী জনগণের অর্থেই সরকারি কর্মজীবীদের বেতন-ভাতাসহ সব ব্যয় বহন করা হয়।’
আগের দিন সরকারি কর্মীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে সরকার। আগামী দুই বছরে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়িত হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা, ভাতাসহ তা ৩৩ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাবে। প্রথম শ্রেণির চাকরিতে প্রারম্ভিক মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা, সব ভাতাসহ তিনি পাবেন ৭০ হাজার টাকার বেশি।
বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই পরিমাণ বেতন যুক্তিযুক্ত কি না, এ নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালে অষ্টম বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সময় সরকার আর কোনো পে-কমিশন না করার কথাও বলেছিল। তবে এবার মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন বেতন কাঠামো করার কথা জানানো হয়েছে।
যদিও গত ১১ বছরে মোট মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮২ শতাংশ এবং এই সময়ে সরকারি কর্মীদের ইনক্রিমেন্ট হয়েছে ৫০ শতাংশ থেকে ৭১ শতাংশ। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে ৫ শতাংশ এবং পরের দুই বছরে ১৫ শতাংশ আর্থিক প্রণোদনা পাচ্ছে কর্মীরা।
তবে ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবানুগ। তিনি বলেন, ‘আর্থিক সক্ষমতার কঠিন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনটি ধাপে সরকারি কর্মজীবীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা খুবই যৌক্তিক। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরকারি কর্মজীবীদের বেতন-ভাতা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে, তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রত্যাশা করা অসম্ভব।’
সরকারি কর্মজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ফলে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিসহ মূল্যস্ফীতি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মনে করে টিআইবি।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইতিমধ্যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে দিশেহারা স্বপ্নআয়ের কর্মজীবী নারী-পুরুষসহ সাধারণ জনগণের দুর্দশা আরও বাড়ার কারণ হিসেবে আবির্ভুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
এক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণসহ বেতন-ভাতা বাস্তবায়নের উল্লিখিত শর্ত বাস্তবায়নে সরকারের দুরদর্শিতা প্রত্যাশা করছে টিআইবি।


