গরমের এক বিকেলে বান্দরবান জেলার জারুলিয়াছড়ি গ্রামে নিজেদের বাঁশের বেড়ার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল ১৭ বছরের নুরুল আবসার। না, ঠিক দাঁড়িয়ে ছিল বলা যাবে না, বরং বলতে হবে দুটি কাঠের ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে।
মাত্র এক বছর আগেও আবসারের হাঁটার জন্য কোনোকিছুর সাহায্য লাগত না। তখন সে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পাহাড়ি অঞ্চলে পাচারকারীদের জন্য গবাদি পশু পরিবহন করত। তেমনই একদিন দৌড়ে চলার সময় তার পায়ের নিচে পড়েছিল ধাতব কোনো বস্তু। আর মুহূর্তেই বিস্ফোরণ, তীব্র আলোর ঝলকানি।
সেদিনের স্মৃতিচারণ করে মৃদু কণ্ঠে আবসার বলে, ‘আমি ভেবেছিলাম আমি মরেই গেছি, এখন আমি বেঁচে আছি এই লাঠিগুলোর জন্য।’
সেই বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ডান পা কেটে ফেলতে হয়েছিল আবসারের। তাই ক্রাচই এখন তার পথচলার সঙ্গী।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে বান্দরবান জেলায় অন্তত ১৬ বাংলাদেশি মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই আহত হয়েছেন ১০ জন। যে সংখ্যাকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। আর এভাবেই সীমান্তের ওপারের সংঘাতের প্রভাব এপারেও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
যেসব মাইনে বাংলাদেশিরা আহত হচ্ছেন, সেগুলো বাংলাদেশি নয়। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী মিলিশিয়া গ্রুপগুলো স্থাপন করে। বহু বছর ধরেই যারা জাতিগত সংঘাতে অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মাইন ব্যবহার করে আসছে। বেশিরভাগ মাইন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। আর সেসব মাইনে আহত হন বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামের মানুষ। যারা দ্রুত কিছু অর্থ উপার্জনের জন্য চোরাকারবারিদের হয়ে গবাদি পশু সীমান্ত পারাপারের কাজ করেন।
বিজিবি-১১ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসকেএম কফিল উদ্দিন কায়েস বলেন, ‘এই বিস্ফোরণগুলোর বেশিরভাগই সীমান্ত রেখার ১০০ গজের মধ্যে ঘটে। কিন্তু যারা আহত হয় তারা বাংলাদেশের নাগরিক। তারা হয়ত সীমান্ত পেরিয়েছিল গবাদি পশু বা মাদক আনতে, কিন্তু ফিরেছে জীবনের বড় ক্ষত নিয়ে।’
গত আগস্টে একটি বন্য হাতি নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়। রামুর দরিয়ারদিঘী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সেই আহত হাতিটি এখনো বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্থানীয় বনকর্মীরা শেষবার আহত হাতিটিকে দরিয়ারদিঘী এলাকাতেই দেখেছিলেন।
খবর পেয়ে যতক্ষণে বন বিভাগের দল চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সেখানে পৌঁছে, হাতিটি রক্তক্ষরণ এবং পানি শূন্যতার কারণে খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পশুচিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছিলেন যে, হাতিটির দীর্ঘমেয়াদী যত্নের প্রয়োজন হবে।
আর এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মিয়ানমারের পেতে রাখা মাইন কেবল সীমান্তের মানুষের জন্যই নয়, সীমান্তবর্মী বনের প্রাণীর জন্যও হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।
আর মাইন বিস্ফোরণের এই বিপদ কেবল যে পাহাড়ের মানুষের জীবনেই সংকট বয়ে আনছে তা নয়। এটি বিস্তৃত বহুদূর পর্যন্ত। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তিন যুবক টেকনাফের নাফ নদীতে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন। যখন তারা মিয়ানমারের জলসীমায় লালদিয়া চর পার হন, তখনই মাটির নিচে বিস্ফোরণ অনুভব করেন।
১৯ বছর বয়সী রোহিঙ্গা নাগরিক মো. যোবায়েরের ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে উড়ে যায়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। কারণে তার পরিবার যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারেনি। আহত অবস্থায় তার সঙ্গী দুই রোহিঙ্গা যুবক কোনোমতে আহত অবস্থায় নদী পেরিয়ে বাড়ি ফেরে।
এই তিন যুবকই দ্বিতীয় প্রজন্মের রোহিঙ্গা নাগরিক। যাদের আদিবাড়ি মিয়ানমারে হলেও বহুদিন ধরে তাদের পরিবারের দিন কাটছে বাংলাদেশের শরনার্থী শিবিরে। কোনো কাগজপত্র বা যথাযথ কাজ না থাকায়, এক দিনের জন্য কাঁকড়া ধরেও জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করে তারা।
অবশ্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই মাইন পুঁতে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বহু বছর ধরেই বলছেন যে, মাইন দিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকার মাঠ এবং নদীর তীর অনেকটা যেন ‘সাজিয়ে’ রেখেছে মিয়ানমার।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা ল্যান্ডমাইন মনিটরের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মিয়ানমার অ্যান্টিপারসোনেল মাইন স্থাপন অব্যাহত রেখেছে। যদিও তারা বিশ্বব্যাপী এই বিশেষ ধরনের মাইন নিষিদ্ধের জন্য জাতিসংঘের বার্ষিক প্রস্তাবনার পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের মাইন ব্যবহারের হার ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
মাইন নিষিদ্ধ চুক্তির এবং মিয়ানমার থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন ছবি পর্যালোচনা করে মনিটর বলছে, মিয়ানমারে তৈরি এসব মাইন সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট থেকে প্রায় প্রতিমাসেই সংগ্রহ করেছে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। দেশটির প্রতিটি অঞ্চলেই ২০২২ সালের শুরুর থেকে ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত এসব ঘটনার খবর পাওয়া যায়। এমনকি ২০২৩ সালের আগস্টে সেনাবাহিনী মাইনকে আরও বিপজ্জনকভাবে বানিয়ে তাদের স্থাপনার আশপাশে পুঁতে রাখত বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশ বহু বছর ধরে মাইন নিষিদ্ধ চুক্তি মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ এই চুক্তি সই করে, ২০০০ সালে নতুন করে অনুমোদন দেয়। এবং চুক্তির অংশ হিসেবে ২০০৫ সালের সময়সীমার মধ্যে এক লাখ ৮৯ হাজার ২২৭টি মাইন ধ্বংস করে।
সরকার বলছে, বাংলাদেশ কখনোই মাইন, রপ্তানি বা নিজের ভূখণ্ডে মাইন স্থাপন করেনি। বাংলাদেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তারাই এই চুক্তির তত্ত্বাবধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তারপরেও সীমান্তে আহত হচ্ছেন, প্রাণ হারাচ্ছেন এই বাংলাদেশের মানুষেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামে, বিশেষ করে নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় বিদ্রোহীদের গোপন আস্তানা থেকে মিয়ানমারে তৈরি মাইন ও বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। ২০০৪ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৮১টি অ্যান্টিপারসোনেল মাইন এবং ৩৬টি যানবাহনবিধ্বংসী মাইন উদ্ধার করা হয়।
সবসময়ই ঢাকা দাবি করে আসছে, তাদের বাহিনী মাইন পুঁতে রাখে না। তবে সীমান্তে পুঁতে রাখা বিদেশি মাইনে এখনো আহত হয়েই যাচ্ছেন দেশটির সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ, বাদ পড়ছে না বণ্যপ্রাণীও। আর এটিই প্রমাণ করে যে, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা এখনও কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই, যার মাধ্যমে মাইন পুঁদে রাখা এলাকাগুলো চিহ্নিত করা যায়। ফলে, বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা উভয়ই নাগরিকরাই ঝুঁকিতে পড়ছেন।
মাইনগুলো শুধুমাত্র একটি সীমান্তের অংশ, যা অবৈধ বাণিজ্যের পথে ‘ফল্ট লাইন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের পুলিশের অনুমান অনুযায়ী, প্রতি বছর মিয়ানমার থেকে ২৫০ মিলিয়ন মেথামফেটামিন ট্যাবলেট চোরাচালান করা হয়। যার বেশিরভাগই আসে বান্দরবান এবং কক্সবাজার জেলার সীমান্ত পেরিয়ে। এছাড়া বহু বছর ধরেই একই পথগুলো গবাদি পশু চোরাচালানের কাজেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এই গ্রীষ্মে সীমান্ত পাহারা দেওয়ার জন্য বিজিবি আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার বা এপিসি চালু করেছে। আগস্ট মাসে বেশ কয়েকজন সুপরিচিত পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। যাদের মধ্যে ‘শাহীন ডাকাত’ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরিচিত একজন—গ্রেফতার হয়েছিলেন। তবে গ্রামবাসীরা বলছেন, প্রকৃত অপরাধীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়েছে।
গর্জনিয়া গ্রামের বাসিন্দা দুই পা হারানো আবদুল্লাহ (৩২) বলেন, ‘যারা আমাদের সীমান্তের ওপারে পাঠায়, তাদের কখনও হাসপাতালে যেতে হয় না। আমাদেরই সব ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।’
গর্জনিয়া এবং জারুলিয়াছড়ির মতো গ্রামগুলিয় গিয়ে দেখা যায়, ২০ বছরের আশপাশের বয়সী তরুণরা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছে বা লাঠিতে ভর করে হাঁটছে। আহতদের কেউ কেউ তো এখনও শিশু। এদের বেশিরভাগই স্কুল ছেড়ে দ্রুত টাকা উপার্জনের জন্য চোরাচালানকারীদের সঙ্গে কাজে নেমেছিল। এখন তাদের জীবন চলছে দাম বা সামান্য ভাতার ওপর। মাইন বিস্ফোরণে হারানো অঙ্গের সঙ্গে হারিয়ে গেছে তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্নও।
বিজিবি স্থানীয় ভাষায় একটি সচেতনতা ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ‘ওইক্যা বোমা ফোডে, আঁরা আর ন যাইম’; যার অর্থ ওখানে বোমা বা মাইন আছে, যার ওপর পা রাখলেই শেষ হয়ে যেতে হবে। তাই ওখানে আর আমরা যাবো না।
এই সতর্কবাণী লেখা পোস্টার লাগানো হয়েছে গ্রামজুড়ে। স্কুলে বুকলেট বিতরণ করা হচ্ছে, ভোরে মাইক থেকে সতর্কতাও ঘোষণা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে ক্যাম্পেইনটি কিছুটা প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে নতুন কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, এটি আসলে একটি সাময়িক ব্যবস্থা।
নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সমস্যাটি আসলে কাঠামোগত। এসব এলাকায় স্কুলের সংখ্যা কম, কাজ পাওয়া যায় না, শিক্ষার হারও কম। ফলে মানুষ এখনো চোরাচালানকেই অর্থ উপার্জনের একমাত্র সুযোগ হিসেবে দেখে।’
জারুলিয়াছড়িতে সন্ধ্যা নামতে শুরু করে। আবসারকে দেখতে পাই ক্রাচ হাতে তার হারানো পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে।
নিজের মনেই সে বলছিল, ‘তারা আমাকে আর কখনো যেতে মানা করেছিল। কিন্তু এটা বলার আর প্রয়োজন ছিল না। তাদের একটি পদক্ষেপই আমার গোটা জীবন ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।’


