মার্কিন নির্বাচন/ পোশাক রপ্তানিতে আশার আলো, সহজে মিলবে না শুল্ক ছাড়

পোশাক রপ্তানিতে আশার আলো, সহজে মিলবে না শুল্ক ছাড়
ছবি: জাকির হোসেন/টাইমস
Advertisement
Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাট দল জয়ী হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে নতুন করে নতুন কোনো বাণিজ্য শুল্ক বসানো এখন আর সহজ হবে না। এতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য মার্কিন বাজারে স্থিতিশীল ব্যবসা পরিবেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এখনই বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক থেকে বড় কোনো ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মেয়াদ আছে আরও দুই বছর। তবে এখন থেকে তার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোকে কংগ্রেসের কড়া জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। ডেমোক্র্যাটরা চাইলেই আগের আইনের আওতায় বসানো শুল্ক সরাসরি তুলে নিতে পারবে না, তবে তারা তদন্ত ও শুনানির মাধ্যমে হুটহাট নতুন কোনো শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ বেশ কঠিন করে তুলতে পারে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য বেশ বড়। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। দেশের মোট তৈরি পোশাকের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই যায় সেখানে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়, শিল্পের প্রবৃদ্ধি এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান ভিত্তি।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে এক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়। সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামাতে রাজি হয়েছিল ওয়াশিংটন। সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু শর্তে কিছু কাপড়ে শূন্য শুল্ক সুবিধার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু পরের কিছু ঘটনায় হিসাব বদলে যায়।

বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশি পণ্যেও নিয়মিত আমদানিশুল্কের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ যুক্ত হয়ে মোট শুল্ক গিয়ে ঠেকেছে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশে।

কংগ্রেসে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে বলেই অতিরিক্ত শুল্ক দ্রুত উঠে যাবে—২০২৭ সালের ক্রয়াদেশ নেওয়ার ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকদের এমন হিসাব করা ভুল হবে। কারণ, বাণিজ্য নীতির ওপর প্রেসিডেন্টের হাতে এখনো যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে, যা কংগ্রেসকে চাইলেই দ্রুত শুল্ক কমানোর সুবিধা দেয় না।

ইতোমধ্যে রপ্তানিতে এই শুল্কের অনিশ্চয়তার ধাক্কা লেগেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মোট মূল্য আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং কাপড়ের গড় দামও ২ দশমিক ২৬ শতাংশ পড়ে গেছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম টাইমসকে বলেন, নির্বাচনে কংগ্রেসে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রমাণ করে গত দুই বছরে আরোপ করা শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কতটা অসন্তোষ ছিল।

তিনি বলেন, ‘এই অযৌক্তিক শুল্কের কারণে শুধু বাইরের দেশগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদেরও মাশুল গুণতে হয়েছে।’

নির্বাচনের এই ফল বিশ্ব বাণিজ্য অংশীদারদের কিছুটা স্বস্তি দেবে আশা করে হাতেম আরও বলেন, ‘মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আমরা আশা করি, মার্কিন সরকার এমন ইতিবাচক পথ বেছে নেবে যা দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে।’

একটি স্থিতিশীল বাণিজ্য নীতি মার্কিন ক্রেতাদের মনে ভরসা ফেরাতে পারে, যারা শুল্কের ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে অর্ডার দিতে ইতস্তত করছিলেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি খুব জরুরি। কারণ, এখানকার রপ্তানি করা পোশাকের বড় অংশই মৌলিক ও সাশ্রয়ী দামের।

আরও পড়ুন

ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. শামীম আহসান টাইমসকে বলেন, ‘আর মাত্র দুই বছর পরই যুক্তরাষ্ট্রে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে ট্রাম্পকে তার অর্থনৈতিক নীতির রাজনৈতিক পরিণতির কথা চিন্তা করতেই হবে। নতুন করে অতিরিক্ত শুল্ক চাপাতে গেলে আগামী নির্বাচনে তার দলের ওপর বড় প্রভাব পড়তে পারে।’

তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির এই পরিবর্তন বৈশ্বিক বাজারকেও প্রভাবিত করবে, যার আঁচ বাংলাদেশেও আসবে। তাই শুধু শুল্ক ছাড়ের আশায় বসে না থেকে বাণিজ্য নীতি যাতে স্থায়ী ও অনুমানযোগ্য হয়, সেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল জানান, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ থাকার ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন কোনো বাড়তি শুল্ক আরোপ করা বেশ কঠিন হবে—বিশেষ করে যেসব বিষয়ে কংগ্রেসের অনুমতি লাগে।

তবে ট্রাম্প এখনো কোনো বিলে ভেটো দিতে পারেন, আর বর্তমান শুল্কগুলো পুরনো আইনের ক্ষমতাবলেই চলছে।

রুবেল জানান, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট দ্বিপক্ষীয় শুল্ক বাতিল করার পর এবং একটি সাময়িক চার্জের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ধারা ৩০১-এর আওতায় ওই অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছিল। তাই ২০২৭ সালের ব্যবসার হিসাব করার সময় রপ্তানিকারকদের এই ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকবে ধরে নিয়েই এগোনো উচিত।

ডেমোক্র্যাটরা ভোটের লড়াইয়ে শুল্কের বিরুদ্ধে কথা বললেও, ট্রাম্প প্রশাসন চাইলে বিদ্যমান নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে পদক্ষেপ নিতে পারে। কংগ্রেস নতুন আইনে বাধা দিলে হোয়াইট হাউস আরও নিজের মতো করে কাজ করার চেষ্টা করতে পারে।

রুবেল সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) যে তদন্তের কথা ভাবছে, তাতে বাংলাদেশের নাম থাকাটা একটি বড় ঝুঁকি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সুতি ও কৃত্রিম সুতা দিয়ে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে যে শুল্কমুক্ত কোটা সুবিধা রয়েছে, তাকে একটি বড় সুযোগ বলে মনে করছেন রুবেল। কারণ, এটি মার্কিন সুতা উৎপাদনকারী এবং বাংলাদেশের পোশাক কারখানা—উভয়ের জন্যই লাভজনক। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে চালু হওয়া এই তিন বছর মেয়াদী বিশেষ সুবিধা বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

এই সুবিধা নির্দিষ্ট পণ্যে পাওয়া যায় এবং এতে পরিমাণের সীমাবদ্ধতাও আছে। এটি শুধু অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক মওকুফ করে, মূল আমদানিশুল্ক থেকেই যায়। ডেমোক্র্যাটরা যেহেতু সাপ্লাই চেইনে জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়, তাই এ ধরনের নিয়মের সঙ্গে সুবিধাটি মিলে যায়।

রুবেল বলেন, এ সংক্রান্ত শুল্কের বিরোধিতা করা ডেমোক্র্যাটদের জন্যও কঠিন, ফলে এগুলো বহাল থাকবে বলেই মনে হয়।

সামনে শ্রম অধিকার, সঠিক মজুরি, কাঁচামালের সঠিক উৎস এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও কড়াকড়ি আসতে পারে। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে শ্রম অধিকার ও নিরাপত্তার অজুহাতে মার্কিন জিএসপি সুবিধা হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তৈরি পোশাক খাত সরাসরি এতে না পড়লেও, কমপ্লায়েন্স বা নিয়ম মেনে চলার গুরুত্ব যে কতটা, সেই শিক্ষা বাংলাদেশ সেখান থেকেই পেয়েছিল।

রুবেল পরামর্শ দেন, ‘বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ানো, সাপ্লাই চেইনের সব নথিপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং নিয়ম মেনে চলাকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবসার মূল শর্ত হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত।’

তিনি আরও জানান, ইরান যুদ্ধ থামাতে কংগ্রেস চাপ দিলে পণ্যের শিপিং খরচ কিছুটা কমতে পারে। যুদ্ধ-ঝুঁকির কারণে এখন প্রতি কনটেইনারে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার ডলার অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। তবে কংগ্রেসে কোনো দল আছে তার চেয়েও আমেরিকানদের নিজেদের কেনাকাটার চাহিদা কমে যাওয়া এবং দাম কমানোর জন্য ক্রেতাদের চাপই বাংলাদেশের ব্যবসার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি ও বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক আসিফ ইব্রাহিম বলেন, এই ফলাফলে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ—দুটোই রয়েছে।

কংগ্রেসের নজরদারির কারণে বাণিজ্য নীতি স্থিতিশীল হলে এবং বাজারে সুযোগ বাড়লে তা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করবে। আবার অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা শ্রমিক অধিকার, ভাল কাজের পরিবেশ ও দায়িত্বশীল কাঁচামাল সংগ্রহের ওপর আরও জোর দেবে। ফলে বাংলাদেশকে কাজের মান বাড়াতে হবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে বাজারে টিকে থাকার প্রতিযোগিতা জোরদার করতে হবে।

আসিফ ইব্রাহিম মনে করেন, কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই আপনা-আপনি শুল্ক কমে যাবে না। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের উচিত দুই রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কূটনীতি বজায় রাখা। পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা এবং দেশের ভেতরের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।’

সবশেষে তিনি বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক শক্তি কখনো ওয়াশিংটনের রাজনীতি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না। বরং তা দেশের নিজস্ব শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং সঠিক অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর নির্ভর করে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad