স্থানীয় শ্রমিক সংকটে যখন চাষাবাদ থমকে যাওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খেটে খাওয়া মানুষের হাত ধরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে মাদারীপুরের শিবচরের কৃষি। বছরজুড়েই এই উপজেলার মাঠগুলোতে কাজ করছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা মৌসুমি কৃষি শ্রমিকরা।
এখন আমন ধান কাটার শেষ মুহূর্ত। খেত থেকে ধান তোলার পাশাপাশি সামনের শীতকালীন ফসলের জন্য জমি তৈরি করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। কেউ পেঁয়াজ ও রসুনের জন্য মাটি তৈরি করছেন, কেউ প্রস্তুত করছেন সরিষার খেত। এই শ্রমিকদের বড় একটি অংশ গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত এই উপজেলায় আসছেন। দিনচুক্তিতে কাজ করে প্রতিদিন তারা পাচ্ছেন ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা।
কৃষকরা বলছেন, এসব বহিরাগত শ্রমিক না থাকলে শিবচরের বিশাল জমিতে চাষাবাদ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ত। তবে দিন দিন শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ে খানিকটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
সম্প্রতি শিবচরের কুতুবপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায় মাঠজুড়ে উৎসবমুখর কাজের পরিবেশ। স্থানীয় কৃষকরা জানান, তারা মূলত একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল ফলান। পাট কাটার পর রোপণ করা হয় আমন ধান। পানি শুকিয়ে এলে আমন ধান কেটে সেই জমিতেই রোপণ করা হয় পেঁয়াজ ও রসুন। অনেকে আবার পেঁয়াজের সাথে বাড়তি ফসল হিসেবে সরিষাও বুনেন।
এই টানা চাষাবাদের কারণেই সারা বছরই নওগাঁ, নেত্রকোনা, কুষ্টিয়া, সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলা থেকে আসা শ্রমিকদের চাহিদা থাকে ব্যাপক। শ্রমিকরা সাধারণত পুরো দিনের জন্য ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং অর্ধেক দিনের জন্য ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি নেন। সাধারণত ৮ থেকে ১০ জন একদল হয়ে একটি ঘর ভাড়া নেন, নিজেরাই রান্না করে খান এবং মৌসুম শেষে জমানো টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
সুনামগঞ্জের শ্রমিক মো. আজাদ জানান, চার-পাঁচ বছর আগে ফরিদপুরের শ্রমিক বাজার থেকে কাজ পেয়ে তিনি প্রথম শিবচরে এসেছিলেন। এরপর থেকে প্রতি মৌসুমেই নিয়মিত আসছেন।
তিনি বলেন, ‘কুতুবপুর বাজারে প্রতিদিন দুপুরে শ্রমিকের হাট বসে। আমরা সকালে কাজ শেষ করে পরের কাজ ধরতে দুপুরের হাটে আসি।’
নেত্রকোনার মো. মনির মিয়ার অভিজ্ঞতা আরও দীর্ঘ। ২০১২ সাল থেকে তিনি শিবচরের মাঠে কাজ করছেন। এখান থেকে আয় করা টাকায় চলে তার চারজনের সংসার, আর নিজের গ্রামের বাড়ির জমির ফসল তুলে রাখেন ভবিষ্যতের জন্য।
একই কথা নওগাঁর জিয়াবুরের। প্রায় ১৪ বছর ধরে এখানে কাজ করা জিয়াবুর জানান, ‘শিবচরের অনেক জমির মালিকই প্রবাসী। তাদের জমি আছে কিন্তু কাজ করার লোক নেই। আগে হাটে গিয়ে কাজ খুঁজতাম, আর এখন মৌসুমে জমির মালিকরা নিজেই ফোন দিয়ে ডেকে নেন।’
কুতুবপুরের কৃষক আলতাফ হোসেন জানান, ১৮ কাঠা জমির ধান কেটে এখন তিনি রসুন চাষের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। এবার ধানের ভাল ফলন হলেও বাড়তি মজুরি নিয়ে তার ক্ষোভ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় শ্রমিক মিলছে না বললেই চলে। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে লোক আনতে হচ্ছে। দিন দিন শ্রমিকের দাম বাড়লেও আমাদের ফসলের দাম তো সেভাবে বাড়ছে না।’
আরেক কৃষক আবুল কাশেমের অভিজ্ঞতা অবশ্য বেশ মধুর। টানা ১২ বছর ধরে একই শ্রমিকরা তার জমিতে কাজ করতে আসায় তাদের সাথে গড়ে উঠেছে এক আত্মিক সম্পর্ক।
একটি ফসলের বিদায় আর নতুন ফসলের আগমনের এই সময়ে শিবচরের সবুজ মাঠজুড়ে ঘুরছেন শত শত শ্রমিকের দল। তাদের হাড়ভাঙা খাটুনিতে একদিকে যেমন সচল থাকছে শিবচরের কৃষি, অন্যদিকে ঘরে ফিরছে শত শত পরিবারের রুটি-রুজি।


