ট্রাম্পের কারণে চাকরি ছাড়তে চান মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর অর্ধেক সদস্য

ট্রাম্পের কারণে চাকরি ছাড়তে চান মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর অর্ধেক সদস্য
ছবি: মার্কিন সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইট
Advertisement
Advertisement

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নীতি ও দুর্বল নেতৃত্বের কারণে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় অর্ধেক সদস্যই চাকরি ছেড়ে দিতে চান। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্প ও তার প্রশাসন রাজনৈতিক স্বার্থে সামরিক সিদ্ধান্ত নেয়।

সোমবার সামরিক বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিলিটারি ডট কম-এ প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দেশটির সামরিক ক্ষেত্রে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্রস্তুতি সংকট’ তৈরি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।

মিলিটারি ডট কম-এ প্রকাশিত ‘কমন ডিফেন্স’ নামের একটি সংস্থার  জরিপ অনুযায়ী, সক্রিয় সামরিক বাহিনীর ৫৩ শতাংশ সদস্যই স্বাভাবিক মেয়াদের আগেই চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে আগ্রহী। কারণ হিসেবে তারা জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী দিন দিন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।

জরিপে আরও দেখা যায়, মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণেই ৪৫ শতাংশ সদস্য চাকরি ছাড়ার কথা চিন্তা করছেন। এছাড়া জরিপে অংশ নেওয়া বাহিনীর ৬৭ শতাংশ সদস্য একমত যে, সেনা সদস্যদের ওপর প্রভাব ফেলে—এমন সিদ্ধান্তগুলো সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির চেয়ে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছে। বিপরীতে এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন মাত্র ২৫ শতাংশ সেনা সদস্য।

ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের তীব্র সংঘাত এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পুনরায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করার চিন্তাভাবনার মাঝেই এই বিস্ফোরক তথ্য সামনে এলো।

‘কমন ডিফেন্স’-এর নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক মার্কিন সেনা সদস্য হোসে ভাসকেজ এ বিষয়ে বলেন, ‘প্রকৃত নেতৃত্ব কেমন হওয়া উচিত, তা সাবেক সেনা সদস্যরা খুব ভালো করেই জানেন। একজন সত্যিকারের নেতার কাজ হলো তার অধীনস্থ মানুষদের প্রতি খেয়াল রাখা এবং সামরিক মিশন থেকে রাজনীতিকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা।’

আরও পড়ুন

হোসে ভাসকেজ ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘বর্তমানে প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৮ জন সাবেক সেনাসদস্য এবং সামরিক পরিবার মনে করছেন তাদের অবহেলা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সক্রিয় সেনা সদস্যরা আমাদের স্পষ্টভাবে বলছেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই তারা বাহিনী ছাড়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য এক বাস্তব ও মারাত্মক প্রস্তুতি সংকট।’

কোন কোন নেতার কারণে বাহিনীতে এই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট করে জানাতেও পিছপা হননি সেনা সদস্যরা। জরিপ অনুযায়ী, সাবেক ও সক্রিয় সেনা সদস্যদের প্রায় ৫০ শতাংশ প্রধান সেনাপতি বা ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’ হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা ও কাজের প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে তাকে প্রতি সমর্থন করেছেন ৪৭ শতাংশ সদস্য।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের মতামত পাওয়া গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৫ শতাংশ সদস্য তার কাজের প্রশংসা করলেও ৫০ শতাংশ সদস্যই তার ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

তবে জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার, যেমন শীর্ষ জেনারেল ও অ্যাডমিরালদের প্রতি সেনা সদস্যদের আস্থা এখনও তুলনামূলক বেশি। ৫৬ শতাংশ সদস্য শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের সমর্থনে মত দিয়েছেন এবং ২৭ শতাংশ সদস্য অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

গত দুই বছর ধরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক রদবদল ও পরিবর্তন এনেছেন। জীবনভর দেশের সেবা করা অভিজ্ঞ শীর্ষ জেনারেল ও সামরিক নেতাদের বরখাস্ত করে তিনি বাহিনীর অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলোকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।

এর সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখা যায় গত সপ্তাহে, যখন অত্যন্ত সম্মানিত কর্মকর্তা ও যুদ্ধাহত অভিজ্ঞ সেনা সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল ব্রেট সিলভিয়াকে জয়েন্ট স্টাফ ডিরেক্টর অব স্ট্র্যাটেজির পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ তোলা হলেও দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, এই বরখাস্তের ঘটনায় বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা ক্ষুব্দ ও হতভম্ব। তারা সিলভিয়াকে একজন অত্যন্ত অনুগত ও সাহসী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি ভবিষ্যতের যুদ্ধ মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ এ পর্যন্ত ৮০ জনেরও বেশি জেনারেল ও অ্যাডমিরালকে বরখাস্ত বা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, যা সশস্ত্র বাহিনীর মোট শীর্ষ কর্মকর্তার প্রায় ১০ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই কর্মকর্তাদের কোনো কারণ না জানিয়েই রাতারাতি বরখাস্ত করা হয়েছে।

একই সময়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, ট্রাম্প ও হেগসেথ নেতৃত্বের অধীনে গোলাবারুদ ও যুদ্ধাস্ত্রের মজুদ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে যেকোনো আন্তর্জাতিক হুমকির মুখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সামরিক সক্ষমতাও অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধটি মার্কিন ইতিহাসেই এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad