ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে তার সেই প্রচেষ্টা রোববার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
দেশটির নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভোটে অনিয়ম ও বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সামগ্রিক নির্বাচনী ফলাফল বাতিল হবে না। একই দিনে ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে আটক সন্দেহভাজনদের কয়েকজনের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধও শিথিল করেছে ইসরায়েলের আদালত।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এরপর থেকেই তার লিকুদ পার্টি অভিযোগ করে আসছে, আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে ‘চুরি’ করেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি লিকুদ নেতারা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের ফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে নেতানিয়াহু বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য জোট গঠন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। এমন জোট গঠিত হলে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হতে পারে।
রোববার ইসরায়েলের নির্বাচন কমিশনের প্রধান, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের প্রধানকে একসঙ্গে দেখা যায়। একটি বিবৃতি দেওয়ার সময় নির্বাচন কমিশনের প্রধান তাদের মাঝখানে বসেছিলেন। এতে নির্বাচনের ফলাফলের বৈধতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর অভিন্ন অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
গত সপ্তাহে উত্থাপিত বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলেও নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফল বহাল থাকবে বলে বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়।
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের পক্ষে কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৭ অক্টোবর ভোটগ্রহণ শুরুর আগে নগদ অর্থভর্তি খামসহ তিন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তারের ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, ওই অর্থ ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল।
এর দুই দিন পর একই ঘটনায় সন্দেহভাজন আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল রা’আমের সম্পর্ক রয়েছে। তবে দলটি এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রোববার তিন সন্দেহভাজনের ওপর আরও বিধিনিষেধ আরোপের জন্য পুলিশের করা আবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা প্রত্যাখ্যান করেন এক বিচারক।
পরে পুলিশ জানায়, আটক ব্যক্তিদের একজনকে কিছু শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে শর্তগুলো কী, তা জানানো হয়নি। আরেকজনকে আট দিন গৃহবন্দী রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তৃতীয় সন্দেহভাজনের আটকাদেশ আরও দুই দিন বাড়ানো হয়েছে।
নির্বাচনে আটটি আসন পাওয়া রা’আম পার্টির নেতা মনসুর আব্বাস এসব গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি এগুলোকে অগণতান্ত্রিক এবং ‘নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন।
১২০ সদস্যের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা নেমে এসেছে ৫৩টিতে। বিদায়ী পার্লামেন্টে তার জোটের সর্বোচ্চ আসনসংখ্যা ছিল ৬৮।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। রা’আমসহ আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো পেয়েছে বাকি ১৯টি আসন।
ফলে নেতানিয়াহুর বিরোধী দুই পক্ষের সম্মিলিত আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের রয়েছে। তবে তারা একসঙ্গে সরকার গঠনে সম্মত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
চলতি সপ্তাহে নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের কথা রয়েছে। এরপর বুধবার থেকে পার্লামেন্টে নির্বাচিত প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক শুরু করবেন ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। এসব বৈঠকে দলগুলো কাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়, তা জানতে চাইবেন তিনি।
আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট এমন একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যার জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করবেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন নেতানিয়াহু ও আইজেনকট।
এরপর শুরু হতে পারে কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক দর-কষাকষি ও জোট গঠনের আলোচনা। প্রথম মনোনীত প্রার্থী সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কাউকে সুযোগ দিতে পারেন। তাতেও সমাধান না হলে আগামী বছরের শুরুর দিকে ইসরায়েলে আবার নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এদিকে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে আইজেনকটের জোট গঠনকে রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের কিছু নাগরিকও তার এই অবস্থানের সঙ্গে একমত।
রোববার রাতে কয়েক ডজন মানুষ আইজেনকটের বাড়ির বাইরে বিক্ষোভ করেন। তাদের একজন শোশানা ইদাসিস বলেন, ‘আমাদের দেশ খুবই ছোট, অত্যন্ত ছোট একটি ইহুদি রাষ্ট্র। আমরা এটিকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবেই রাখতে চাই।’
তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এর চেয়ে বড় সমাবেশও হয়েছে, যেখানে ইহুদি ও আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে জোট সরকার গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
লিকুদ পার্টি নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগও তুলেছে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলের নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে তদন্ত শুরু করেছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত।
তবে নির্বাচন কমিশনের প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ বলেছেন, ‘আমাদের অবস্থান হচ্ছে, সন্দেহগুলো সত্য প্রমাণিত হলেও তা সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা কিংবা নির্বাচনের ফলাফলের বৈধতা ক্ষুণ্ন করবে না।’
তার বক্তব্যের পরপরই প্রতিক্রিয়া জানায় লিকুদ পার্টি। দলটি প্রশ্ন তোলে, গুরুতর অভিযোগ থাকার বিষয়টি স্বীকার করার পরও নির্বাচন কমিশনের প্রধান কীভাবে বলতে পারেন যে এসব অভিযোগ চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
অন্যদিকে রোববার নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ প্রতিপন্ন করার সুসংগঠিত প্রচার চালানোর অভিযোগ এনেছেন আইজেনকট।
তার অভিযোগ, নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিরোধী দলগুলোকে সমর্থন দিয়েছে কাতার।
আইজেনকট জানান, নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে চলমান তদন্ত সম্পর্কে শিন বেত তাকে অবহিত করেছে।
তবে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কোনো কার্যক্রমে অর্থায়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছে কাতার।
ইসরায়েলের অনেক নাগরিক উপসাগরীয় আরব দেশ কাতারকে হামাসের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখেন। দেশটির প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে আগেও ইসরায়েলের রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক হয়েছে।
এমনই একটি ঘটনায় অভিযোগ ওঠে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে নেতানিয়াহুর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী কাতারের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেছিলেন।
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের অভিযোগ, তিনি ভয়ভীতি ছড়ানোর কৌশল ব্যবহার করছেন এবং আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল ও ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্য আরও বাড়ানোর উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করছেন।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব নাগরিক। বিরোধীদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্য তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টার অংশ।
আরব রাজনৈতিক দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন গত সপ্তাহে বলেন, নির্বাচনের দিন লিকুদ পার্টি ও নেতানিয়াহুর প্রকাশিত প্রচারসামগ্রীর অর্ধেকের বেশি ছিল আরব ভোটারদের বিরুদ্ধে।
নির্বাচনে ১১টি আসন পেয়েছে জয়েন্ট লিস্ট। জাবারিনের অভিযোগ, ডানপন্থী ইসরায়েলি ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করতেই আরব ভোটারদের লক্ষ্য করে এসব প্রচার চালানো হয়েছিল।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশলের সমালোচনা করে জাবারিন বলেন, ‘সংকটের মুহূর্তে তিনি তার পুরোনো কৌশলে ফিরে যান। সেটি হলো বর্ণবাদী উসকানি দেওয়া এবং আরব জনগোষ্ঠীর বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।’


