ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলেছে। বৃহস্পতিবার তারা দাবি করে, হয়তো বিদেশি সহায়তায় নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেনি নেতানিয়াহুর দল।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ঐতিহাসিক সাফল্যের পর প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আরব জনগোষ্ঠীকে বিতর্কিত করে তোলার চেষ্টা করছেন। নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই তিনি এমন অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। এর আগের নির্বাচনে পার্লামেন্টে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এই জোটের নিয়ন্ত্রণে ছিল ৬৮টি আসন।
অন্যদিকে এবার নেতানিয়াহুর প্রধান বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। বাকি ১৯টি আসনে জয় পেয়েছে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো।
বিরোধী দলগুলো যদি আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে তারা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে জোট সরকার গঠন করতে পারে। তবে ইসরায়েলের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন জোট গঠন বিরল এবং রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
নির্বাচনের সব ভোট গণনা শেষ হলেও ফলাফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি। আগামী বুধবার ফলাফল চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে দেশটির প্রেসিডেন্টের কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র থেকে বের হওয়া ভোটারদের ওপর পরিচালিত জরিপে নেতানিয়াহুর পিছিয়ে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়ার পর থেকেই লিকুদ আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলতে শুরু করে।
তবে নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে ইসরায়েলের নির্বাচন কমিটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ বক্তব্য দেওয়ার পর এসব অভিযোগ ফের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সোলবার্গ দাবি করেন, নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়ে তার কাছে ‘গুরুতর সন্দেহের’ তথ্য এসেছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি বলেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা তিনি নিজে যাচাই করতে পারেননি। তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় তিনি সংস্থাটিকে এ বিষয়ে তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছেন।
এরপর নেতানিয়াহুর দল লিকুদ এক প্রতিক্রিয়ায় দাবি করে, ‘ইসরায়েলের নির্বাচন চুরি হয়ে গেছে!’
দলটির অভিযোগ, নির্বাচনে ‘বিদেশি’ হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল নেসেটের নিয়ন্ত্রণ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া, ইসরায়েলকে ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং ডানপন্থী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। তবে এসব দাবির পক্ষেও কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি লিকুদ।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিকুদের কয়েকজন সদস্য নির্বাচনে ‘হস্তক্ষেপের’ জন্য কাতারকে দায়ী করছেন। ইসরায়েলের অনেক নাগরিক কাতারকে গাজাভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন হামাসের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিবেচনা করেন।
তবে কাতার তাৎক্ষণিকভাবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র কর্মকর্তারা অভিযোগগুলোকে ‘হাস্যকর ও বিপজ্জনক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এদিকে শুক্রবার ভোরে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সময় নির্বাচন কমিশন জানায়, গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। কমিশনের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে এ বিষয়ে বিস্তারিত না জানালেও এক ভিডিও বার্তায় সতর্ক করে বলেন, তদন্ত নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’।
লিভনে বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের কাছে যে চূড়ান্ত ফলাফল জমা দেওয়া হবে, এই তদন্ত তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। একইভাবে এটি ইসরায়েলি জনগোষ্ঠীর কোনো নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গেও সম্পর্কিত নয়।’
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট অভিযোগ করেছেন, লিকুদ নির্বাচনের ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘তারা (নেতানিয়াহুর দল) এটা করছে, কারণ তারা হেরে গেছে।’
বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে ব্যঙ্গ করে আইজেনকট বলেন, ‘আমি স্বাগত জানাই, নেতানিয়াহু অবশেষে ইসরায়েল রাষ্ট্রে কাতারের হস্তক্ষেপের নিন্দা করছেন।’
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, তার সাবেক কয়েকজন শীর্ষ সহযোগী কাতারের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে নেতানিয়াহু মূলত তার বিরোধীদের সঙ্গে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্ভাব্য জোট গঠনের পথ বন্ধ করতে চাইছেন বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলের নির্বাচন/ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েও ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার পথে নেতানিয়াহু
এর আগে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আইজেনকট যদি আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলান, তবে তা দেশদ্রোহিতার শামিল হবে। অথচ এই দলগুলোর সমর্থন পেলে আইজেনকট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন।
এদিকে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করে শিন বেত জানিয়েছে, তাদের তদন্তের উদ্দেশ্য জনগোষ্ঠীর কোনো অংশকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়। বিশেষ করে যারা গণতান্ত্রিক ও আইনসম্মতভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা এই তদন্তের লক্ষ্য নয়।
এক পার্লামেন্ট সদস্যকে পাঠানো চিঠিতেও নির্বাচন কমিটি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়, তদন্ত চললেও নির্বাচনের ‘স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা’ পরিকল্পিতভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
নির্বাচন কমিটি এ বিষয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে শিন বেতের কাছ থেকে তদন্তের ফলাফল চেয়েছে।
নির্বাচনের আগেও নেতানিয়াহু ও তার দল লিকুদ আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোকে ইসরায়েলের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে দেশটির আরব নাগরিকদের আরও প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিকেরা ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। তবে অন্য ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের সহানুভূতি থাকার কারণে ইসরায়েলের অনেক মানুষ তাদের সন্দেহের চোখে দেখেন।
নির্বাচনী প্রচারে আরব জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক বক্তব্য এবং তার নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী সরকারের প্রতি ক্ষোভ আরব ভোটারদের ব্যাপকভাবে ভোটকেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত করেছে। এবারের নির্বাচনে তাদের নজিরবিহীন অংশগ্রহণ দেখা যায়।
বৃহস্পতিবার ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়াইর গোলান অভিযোগ করে বলেন, ‘নেতানিয়াহু জনগণের ইচ্ছাকে, বিশেষ করে আরব জনগণের ইচ্ছাকে অবৈধ প্রমাণ করার কুৎসিত প্রচারের মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন।’
আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট পার্টিও বৃহস্পতিবার পাল্টা অভিযোগ করে বলেছে, ‘নেতানিয়াহুই নির্বাচন চুরি করার চেষ্টা করছেন।’
অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম পার্টির প্রধান মানসুর আব্বাস নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার দলের সঙ্গে এ ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। একই সঙ্গে তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক প্রচার চালানোর অভিযোগ তুলেছেন।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সংবেদনশীল মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যে জনগোষ্ঠী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছে, তাদের সবার সুনাম ক্ষুণ্ন করা উচিত নয়।’
নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক সপ্তাহে ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিশেষ করে ইহুদি ও আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো ঐতিহাসিক কোনো জোট গঠন করবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কোনো দল সেই অবস্থান থেকে সরে এসে তার সঙ্গে সরকার গঠনে যোগ দেবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
১২০ সদস্যের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সমর্থন আদায়ের রাজনৈতিক আলোচনা চলার মধ্যেও নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হারালে নেতানিয়াহুকে একাধিক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। সমালোচকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি যেসব পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, ক্ষমতা হারানোর পর সেগুলো সামনে চলে আসতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির অভিযোগের জবাবদিহি। একই সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে চালানো ভয়াবহ হামলা ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়েও তদন্ত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত।
এদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট নির্দিষ্ট কিছু শর্তে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা উন্মুক্ত রেখেছেন।
আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ না দিলেও পরবর্তী পার্লামেন্টে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোকে সমর্থন দিয়ে নিজেদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগাতে পারে। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে নিয়ে জোট সরকার গঠনের সমর্থনে বৃহস্পতিবার রাতভর তেল আবিবে ছোট ছোট সমাবেশ হয়েছে। তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি রক্ষণশীল জেরুজালেমেও একই দাবিতে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইসরায়েলের ইতিহাসে ২০২১ সালের আগে কোনো আরব রাজনৈতিক দল জোট সরকারে যোগ দেয়নি। ওই বছর প্রথমবারের মতো একটি আরব দল সরকারে অংশ নিলেও সেই অভিজ্ঞতা ছিল স্বল্পস্থায়ী।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একাধিক প্রচেষ্টার পরও নতুন সরকার গঠন সম্ভব না হলে আগামী বছরের শুরুর দিকে ইসরায়েলে আবার নির্বাচন আয়োজন করতে হতে পারে। তবে বুধবার প্রেসিডেন্ট হারজগ ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি নতুন নির্বাচন এড়াতে চান। বিরোধী নেতা আইজেনকটও একই অবস্থান জানিয়েছেন।
আবার নির্বাচন হলে নতুন করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসবে। বিশেষ করে এবারের মতো আরব নাগরিকেরা আবারও বিপুলসংখ্যায় ভোট দিতে আসবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
একই সঙ্গে এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা হাজার হাজার ইসরায়েলি নাগরিক আবারও একই উদ্যোগ নেবেন কি না, সেটিও প্রশ্ন। এসব ভোটারের অনেকেই জানিয়েছিলেন, নেতানিয়াহুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই তারা বিদেশ থেকে ইসরায়েলে ফিরে ভোট দিয়েছেন।


