রাজধানী ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন কারখানা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে অল্প মজুরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করছেন বহু নারী শ্রমিক। অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন তারা। তবুও জীবিকার তাগিদে এসব ঝুঁকি মেনে নিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
কেউ প্লাস্টিক ও পলিথিন বাছাই করে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করেন, আবার কেউ কাজ করেন ধাতব গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরির কারখানায়। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করে তাদের আয় হয় কেবল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
এসব কারখানাগুলোতে তীব্র দুর্গন্ধ, ধুলাবালি ও শিল্পবর্জ্যের মধ্যেই কাজ করতে বাধ্য হন শ্রমিকরা। অনেকের কাছে নেই পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী। এমনকি কর্মস্থলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসেই খাবার খেতে বাধ্য হন কেউ কেউ।

বছরের পর বছর এমন পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে অনেক নারী শ্রমিক চর্মরোগ, চুলকানি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তাদের আশঙ্কা, শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে একসময় কাজ ছেড়ে দিতে হতে পারে। এতে তাদের আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যাবে বলে শঙ্কা জানান অনেকে।
অন্যদিকে কোনো শ্রমিক অসুস্থতার কারণে কাজ চালিয়ে যেতে না পারলে কারখানার মালিকেরা তার জায়গায় নতুন শ্রমিক নিয়োগ দেন।
এক নারী শ্রমিক জানান, তিনি আগে প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করতেন। বর্তমানে ধাতব গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরির একটি কারখানায় কাজ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে চুলকানির সমস্যায় ভোগার পর তার শরীরে ছোপ ছোপ সাদা দাগ দেখা দিয়েছে।
কী কারণে এই সমস্যা হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন। তবে ওই শ্রমিকের ধারণা, বছরের পর বছর রাসায়নিক পদার্থ ও ধুলাবালির সংস্পর্শে কাজ করার কারণে এমনটি হতে পারে।

আরেক নারী শ্রমিক শাহিনুর (৪০) জানান, কারখানায় যান্ত্রিক দুর্ঘটনায় তার একটি আঙুল কাটা পড়ে। ওই দুর্ঘটনার পর তিন থেকে চার বছর তিনি কোনো কাজ করতে পারেননি।
শাহিনুর জানান, দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকলেও কারখানার মালিকের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি। এখন আবার তিনি সেই একই কাজে ফিরেছেন। তবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার কারণে নয়, শাহিনুর কাজে ফিরেছেন জীবিকা নির্বাহের অন্য কোনো উপায় খুঁজে না পাওয়ায়।

বাংলাদেশের স্টেট ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা মুহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেছেন, ছোট-বড় সব কারখানায় শ্রম আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করলে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। এতে কারখানাগুলো অভিজ্ঞ শ্রমিক হারাবে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শ্রমিক সংগঠনগুলোকে সোচ্চার হওয়ারও তাগিদ দেন।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। তবে কামরাঙ্গীরচরের এসব কারখানায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এখানকার অনেক নারী শ্রমিকের কাছে শ্রম আইনের সুরক্ষা কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে ধাতব সামগ্রী উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে অবদান রাখছেন এসব নারী। অথচ তাদের কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব ও দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পরও প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ার ঘটনা শ্রমিকদের অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।

জীবিকা অর্জন করতে গিয়ে যেন কাউকে নিজের স্বাস্থ্য বিসর্জন দিতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী, নিরাপদ যন্ত্রপাতি, স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ এবং দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের যথাযথ সহায়তা জরুরি।
সংসার চালানোর সংগ্রামে জীবিকা ও নিরাপত্তার মধ্যে কঠিন সমন্বয় করে প্রতিটি দিন কাটাতে বাধ্য হন কামরাঙ্গীরচরের নারী শ্রমিকরা। তবু তাদের প্রত্যাশা, একদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের দুর্দশার দিকে নজর দেবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। জীবিকা অর্জনের মূল্য যেন আর নিজের স্বাস্থ্য দিয়ে দিতে না হয়, সেই আশাতেই কাজ করে যাচ্ছেন তারা।


