আজ ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এই সময়ে এ ভোটকে তার সরকারের জনপ্রিয়তার বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করছে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কোন দলের হাতে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন চার বছর পর হলেও কংগ্রেসের নির্বাচন হয় প্রতি দুই বছর পরপর। অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের ঠিক মাঝপথে এই নির্বাচন হয় বলেই একে ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন’ বলা হয়।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে কোনো ভোট নেই। দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সব আসন এবং উচ্চকক্ষ সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়। পাশাপাশি এবার দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর এবং স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ পদেও নির্বাচন হচ্ছে।
প্রতিনিধি পরিষদ
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের মোট আসন ৪৩৫টি। প্রতি দুই বছর পর পর এর সব কটি আসনেই নতুন করে নির্বাচন হয়। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান পার্টির ২১৮ জন এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪ জন সদস্য আছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন একজন, আর দুটি আসন শূন্য।
অল্প ব্যবধানে হলেও বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে এবারের নির্বাচনে সব আসনে ভোট হওয়ায় হিসাব পাল্টে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা যদি প্রয়োজনীয় আসন জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের যেকোনো আইন পাস বা বাজেট অনুমোদনের কাজ বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
সিনেট
অন্যদিকে, উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০ জন সদস্যের মেয়াদ ছয় বছর হলেও প্রতি দুই বছর পর পর এর এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। এবারের নির্বাচনে নিয়মিত ৩৩টি এবং বিশেষ দুটিসহ মোট ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে।
ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যের দুটি আসনে বিশেষ নির্বাচন হওয়ার কারণ এই দুই অঙ্গরাজ্যের নির্বাচিত সিনেটর মার্কো রুবিও ও জেডি ভ্যান্স ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। রুবিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ভ্যান্স ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে সিনেট ছাড়েন। অবশ্য এ দুটি আসনে অস্থায়ীভাবে দুজন রিপাবলিকানই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩ জন এবং ডেমোক্র্যাট-সমর্থিতদের সংখ্যা ৪৭ জন। ডেমোক্র্যাটদের জন্য সিনেট পুনরুদ্ধার করতে হলে অন্তত চারটি আসন বাড়াতে হবে, আর রিপাবলিকানরা বড় জোর দুটি আসন হারালেও তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে।
পূর্বাভাস
ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট ও ফক্স নিউজের মতো প্রভাবশালী মার্কিন জরিপ সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের পূর্বাভাসে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। তাদের মতে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে বেশ কয়েকটি আসন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে।
প্রতিনিধি পরিষদ নিয়ে কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা এবার ১২ থেকে ২৫টি আসন পর্যন্ত বাড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে দলটির আসনসংখ্যা সর্বোচ্চ ২৪০-এ পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, সিনেট নিয়ে ফক্স নিউজের ১ নভেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে টস-আপ বা অনিশ্চিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের মূল্যায়নে ডেমোক্র্যাটরা ১০০ সদস্যের সিনেটের ৪৮টি আসনে এবং রিপাবলিকানরা ৪৭টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। বাকি পাঁচটি আসনকে অনিশ্চিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সম্ভাব্য পরিস্থিতির একটিতে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ৫৪ এবং অন্যটিতে রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ৫২ পর্যন্ত হতে পারে বলে ফক্স নিউজের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
গভর্নর
কংগ্রেসের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৩৬টিতে এবার গভর্নর নির্বাচন হচ্ছে। একটি অঙ্গরাজ্যের প্রশাসন ও বাজেট পরিচালনার ক্ষেত্রে গভর্নরের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এই ৩৬টি পদের অর্ধেক ডেমোক্র্যাট এবং অর্ধেক রিপাবলিকানদের দখলে থাকায় এই পদগুলো ধরে রাখতেও দুই দলের মধ্যে চলছে কঠোর লড়াই।
ফলাফলের প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবে ধরা হয়। কারণ, কংগ্রেসের যেকোনো এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে চলে গেলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ভবিষ্যতে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের মনোনীত মন্ত্রিসভার সদস্য, ফেডারেল বিচারক এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ অনুমোদনের সাংবিধানিক ক্ষমতা ভোগ করে সিনেট। ফলে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় বিপত্তি হতে পারে।
এ কারণে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা পরিবর্তনের নির্বাচন নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি, অর্থনীতি, অভিবাসন, পররাষ্ট্রনীতি এবং বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও এর ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে রিপাবলিকানদের লক্ষ্য সব কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, আর ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য অন্তত একটি কক্ষ দখল করে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিমালায় শক্ত বাধা সৃষ্টি করা।


