জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় ১৯ বছরের জুয়েল রানার শারীরিক অবস্থা বেশ ভালো ছিল। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
জামালপুরের সরিষাবাড়ীর একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করার পর জুয়েলের ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তখন তার রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার।
সেদিন রাত ১০টার দিকে অবস্থার অবনতি হলে পরিবার তাকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরের দিন সকালে আবার পরীক্ষা করালে দেখা যায়, তার প্লাটিলেট কমে মাত্র ১৫ হাজারে নেমে এসেছে।
সকাল ১০টার দিকে ওয়ার্ড পরিদর্শনের সময় একজন চিকিৎসক রিপোর্ট দেখে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে জুয়েলকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। প্রথমে প্লাটিলেট ১৮ হাজার থাকলেও পরে তা বেড়ে ৩০ হাজার হয়, কিন্তু পরের দিনই তা আবার কমতে শুরু করে।
অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান।
জুয়েলের নানা আব্দুস সালাম টাইমসকে জানান, ‘আইসিইউর নার্সরা তাদের বলেছিলেন. কোনো ওষুধই কাজ করছে না। অ্যান্টিবায়োটিক তার চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তুলছিল।’
রোববার দুপুর পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে যে আটজন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে জুয়েল ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সী।
সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আটজনের মৃত্যুর কারণ ছিল ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’। এটি ডেঙ্গুর একটি মারাত্মক জটিলতা, যার কারণে রোগীর অবস্থা খুব দ্রুত খারাপ হতে পারে।
এসব মৃত্যু সামনে এনেছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় শহরগুলোর বাইরে সময়মতো জরুরি আইসিইউ বা উন্নত চিকিৎসা পাওয়া কতটা কঠিন সেই চিত্র। উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের এখন বড় হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।
একই দিনে মারা যাওয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের রুনু বেগমের পরিবারও আইসিইউ পেতে দেরি হওয়ার অভিযোগ করেছে। গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে রাত দেড়টার দিকে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রচণ্ড সংকটজনক অবস্থায় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাকে ভর্তি করলেও তার জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা করা যায়নি।
রুনুর ছেলে নাফিজ টাইমসকে জানান, মাকে রাজশাহী মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি আইসিইউর জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু দিনটি শুক্রবার হওয়ায় কোনো সিনিয়র চিকিৎসক ছিলেন না, তাই ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। সিনিয়র চিকিৎসকের অপেক্ষায় থেকে ভোরের দিকে মারা যান রুনু বেগম।
আরেক রোগী ৬২ বছরের নূর আয়েশাও আইসিইউ বেডের অপেক্ষায় থেকে মারা গেছেন। তার ছেলে রফিকুল কাদের জানান, মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তিনি শুক্রবার তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
রফিকুল কাদের টাইমসকে বলেন, ‘শনিবার মায়ের অবস্থা আরও খারাপ হলে হাসপাতাল থেকে আমাদের জানানো হয় আইসিইউতে কোনো বেড খালি নেই। তারা আমাদের নাম ও ফোন নম্বর লিখে রাখতে বলে, কিন্তু বেড পাওয়ার আগেই মা মারা যান।’
মাজিদ বেপারী (৫০) নামের আরেক ব্যক্তি প্রথমে মাদারীপুরে জ্বর নিয়ে চিকিৎসা নেন, পরে তাকে রাজধানী ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠানো হয়।
তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল, তবে রোগের সঙ্গে ১০ দিন লড়াই করার পর তিনি মারা যান।
এক দিনে এমন আটটি মৃত্যুর ঘটনা দেখিয়ে দেয় ডেঙ্গু কতটা মারাত্মক হতে পারে এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় কতটা ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত আইসিইউ, হাই-ফ্লো অক্সিজেন এবং ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের রোগীদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের ভালো ব্যবস্থা আছে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম হলো ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ। এতে রক্তনালী থেকে তরল পদার্থ লিক হয়ে পেট বা বুকে জমে যায়।
রক্তনালীতে তরল কমে যাওয়ায় রক্তচাপ হঠাৎ অনেক কমে যায়। ফলে হৃৎপিণ্ড, কিডনি এবং মস্তিষ্কের মতো শরীরের জরুরি অঙ্গগুলোতে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। এতে রোগীর রক্তচাপ হঠাৎ পড়ে যায় এবং নাড়ি খুব দুর্বল ও দ্রুত চলতে থাকে।
দ্রুত চিকিৎসা এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে না রাখলে এসব রোগীর অবস্থা মুহূর্তের মধ্যে খারাপ হতে পারে।
এ বছর শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বাড়ার কথা উল্লেখ করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শাহ মো. গালিব আলম।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘এর ফলে আইসিইউর চাহিদাও অনেক বেড়েছে। অনেক সময় আইসিইউ বেড খালি না থাকায় সাধারণ ওয়ার্ডেই হাই-ফ্লো অক্সিজেন দিয়ে রোগীদের সামলানোর চেষ্টা করি। কিন্তু রোগীরা যখন অনেক দেরিতে আসেন, তখন চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে। যে কারণে অনেককেই বাঁচানো সম্ভব হয় না।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোশতাক হোসেন টাইমসকে বলেন, জেলা হাসপাতালগুলোতে অন্তত হাই-ফ্লো অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত অনেক রোগীকে বাঁচানো যেত।
তিনি জানান, এ ধরনের রোগীদের অবস্থা হঠাৎ করেই খারাপ হতে পারে, তাই চিকিৎসকদের হাতে সময় থাকে খুব কম।
তিনি আরও বলেন, ‘কাছাকাছি হাসপাতালেই যদি জরুরি এই সেবাগুলো পাওয়া যায়, তবে রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় দৌড়াতে হবে না। স্থানীয়ভাবেই দ্রুত জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।’
এদিকে, দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। রোববার দুপুর পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৯২৯ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদিন পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২৭ জনে।
এ বছর হাসপাতালে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৬ হাজার ১১৪ জন রোগী।


