হকার উচ্ছেদ: নগর শৃঙ্খলা বনাম প্রান্তিক মানুষের জীবিকা

হকার উচ্ছেদ: নগর শৃঙ্খলা বনাম প্রান্তিক মানুষের জীবিকা
গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন মিরপুর ও গুলিস্তান এলাকায় ২,১০০টিরও বেশি হকার স্টল উচ্ছেদ করেছে। এর ফলে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো পথচারীরা মিরপুর-১ গোলচত্বর, শাহ আলী মাজার ও গুলিস্তানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর নির্ধারিত ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন। নিঃসন্দেহে এটি নগর শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন। তবে একই সঙ্গে এই উচ্ছেদ হাজারো প্রান্তিক পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস কেড়ে নিয়েছে—যা কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নয়।

উচ্ছেদের ইতিবাচক দিক সুস্পষ্ট। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে, গুলিস্তান-সদরঘাট প্রধান সড়কের পাশে এবং মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর সংলগ্ন এলাকার অস্থায়ী দোকান সরিয়ে ফেলায় যানবাহন চলাচল দৃশ্যত উন্নত হয়েছে। পথচারীরা এখন ফুটপাত থেকে সরে সরাসরি চলমান যানবাহনের পথে নামতে বাধ্য হচ্ছেন না, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমেছে। যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা এবং অস্থায়ী পলিথিন-বাঁশের কাঠামোর কারণে শহরের সৌন্দর্য ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা যে ব্যাহত হতো, তা-ও কমেছে। এলাকাগুলোর পরিবেশ এখন তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে।

ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি যুক্তি রয়েছে। শহরের বড় বড় মার্কেটের আশেপাশে ফুটপাতে গড়ে ওঠা দোকান অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে। মার্কেটে দোকান চালাতে যেখানে পজেশন ও ইউটিলিটি খরচ বহন করতে হয়, সেখানে ফুটপাতের দোকানে তেমন খরচ নেই বললেই চলে—এমনকি ট্রেড লাইসেন্স বা আয়কর দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ফলে একই পণ্য মার্কেটের নিচেই অনেক কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়, যা বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষতিকর।

কিন্তু এই উচ্ছেদ এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এমন পরিস্থিতিতে গুলিস্তান ও মিরপুরের হকাররা তুলনামূলক সস্তা মূল্যে কাপড়, জুতো, ব্যাগ ও গৃহস্থালি পণ্য সরবরাহ করত। তাদের উচ্ছেদে অনেক সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও নিম্নবিত্ত মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কেনার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একই সঙ্গে মিরপুরে, গুলিস্তান সহ অন্যান্য অঞ্চলের শত শত পরিবার হঠাৎ করেই তাদের আয়ের প্রধান উৎস হারিয়েছে।

সমস্যার একটি গভীর মাত্রা হলো—হকারদের জন্য কার্যকর কোনো বিকল্প জায়গা না থাকায় সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি চলে যাওয়ার ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যেই অনেকে ফিরে এসে পুনরায় দোকান বসানোর কসরৎ করছেন। এই চিত্র শুধু মিরপুর বা গুলিস্তানে নয়, ঢাকার প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে—এমনকি গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরা এলাকাতেও ফুটপাত মার্কেট দেখা যায়। এটি প্রমাণ করে, শুধু উচ্ছেদ দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

আরও পড়ুন

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ফুটপাতের হকারদের কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, লাইনম্যান এবং কিছু অসাধু মহলের মধ্যে কোটি কোটি টাকার চাঁদার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। উচ্ছেদের ফলে এই চক্র সাময়িক বাধার মুখে পড়েছে। কিন্তু চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট ভেঙে চাঁদাবাজদের কঠোর আইনের আওতায় না আনলে কদিন পরেই আগাছার মতো হকার মার্কেট আবারও চলার পথ বন্ধ করে দেবে।

এ পরিস্থিতিতে ঢাকা সিটি হকার ব্যবস্থাপনা নীতি-২০২৬’-এ ডিজিটাল আইডি প্রবর্তনের পাশাপাশি হকারদের ব্যবসা কেবল রাতের বেলা বা ছুটির দিনের বাজারে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে—যা একটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। পৃথিবীর অনেক বড় শহরেই নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য হলিডে মার্কেট, নাইট মার্কেট বা হকার্স মার্কেট রয়েছে। আমাদের দেশেও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় এরকম মার্কেট চালু ও সচল রাখতে হবে। গুলিস্তানের বঙ্গবাজার, উত্তরার রাজউক কর্মচারী কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের মতো পরিকল্পিত মার্কেটের মডেল এ ক্ষেত্রে অনুসরণীয় হতে পারে।

হকারদের নিজেদের দাবিও যুক্তিসঙ্গত। তারা বলছেন, নতুন বাজার করা হলে ৪ ফুট বাই ৫ ফুটের চেয়ে বেশি জায়গা যেন বরাদ্দ হয়, যাতে তারা তাদের ভ্যান ঠিকমতো রাখতে পারেন। পাশাপাশি জায়গা বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং গোপনে ঘুষ লেনদেনের মতো অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। এখন সতর্ক না হলে সেই দুর্নীতি সহজেই ফিরে আসতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, ঢাকার মতো মেগা শহরে জনগণের রাস্তায় নিরবিচ্ছিন্ন চলাচল, অতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান—এই তিনটি বিবেচনাকে সমন্বয় করে সমস্যার টেকসই সমাধান খুঁজে বের করাই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রকৃত দায়িত্ব। কোনো হটকারী বা আবেগতাড়িত সিদ্ধান্তে সমস্যার প্রকৃত সমাধান হবে না, বরং আরও দুর্ভোগ সৃষ্টি হবে। নগর শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের জীবিকা সুরক্ষায় পরিকল্পিত হকার্স মার্কেট গড়ে তোলা এবং চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad