সবজির উচ্চমূল্য/ গ্রামে দাম পায় না কৃষক, ঢাকায় কিনতে হিমশিম ভোক্তা

গ্রামে দাম পায় না কৃষক, ঢাকায় কিনতে হিমশিম ভোক্তা
ছবি: শামীম-উস-সালেহীন/টাইমস
Advertisement
Advertisement

যশোরের চুড়ামনকাটির কৃষক আবদুল আলিম আড়তে প্রতি কেজির শিম ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি করতে পারলেই খুশি। ঢাকার কারওয়ানবাজারে গত কয়েকদিনে কিছুটা কমে এই সবজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। এই বাজারের এক থেকে দুই কিলোমিটার দূরেই দাম ১০০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি।

উৎপাদনের খরচ দিন দিন বেড়ে যাওয়ার কারণে আলিমরা যখন লাভ-লোকসানের মাঝামাঝি অবস্থায় দাঁড়িয়ে নিত্য হিসাবে ব্যস্ত, তখন রাজধানীর বাজারের এই উচ্চমূল্যের খবর আবার সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের সুবাদে পৌঁছে যাচ্ছে তাদের কাছে।

এই কৃষক বলেন ‘শুনি ঢাকার বাজারে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য কষ্টের। কারণ, আমরা সবজি উৎপাদন করে প্রায়ই লাভ করতে পারছি না।’

নিত্যপণ্যের মধ্যে কৃষক থেকে বাজার পর্যায়ে সবজির দামের পার্থক্য অন্যান্য খাদ্যপণ্যের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। একে পচনশীল দ্রব্য, তার ওপর খুচরা পর্যায়ে অতি মুনাফার প্রবণতা এবং দাম ধরে রাখতে বিক্রেতাদের একজোট মনোভাবের কারণে ভোক্তাদেরকে অনেক বেশি দাম দিতে হয়।

কৃষকের কাছ থেকে কেনা সবজি কয়েক হাত ঘুরে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে দাম হয়ে যাচ্ছে ক্ষেত্র বিশেষে তিনগুণ। যশোর ও বগুড়ায় আড়তের তুলনায় ঢাকার কয়েকটি বাজারের দামের চিত্রে এই বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

বগুড়ার মহাস্থানের কৃষক লতিফুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘সার, বীজ, কীটনাশক, সেচের ডিজেল ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এবার উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সরবরাহ বাড়ার কারণে গত ১৫ দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত কমেছে। উৎপাদন খরচ উঠে আসবে কিনা সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।’

ঢাকার কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল, শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা পেঁপে ২৫ থেকে ৩০ টাকা টাকা, পটল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শিম ৭০ থেকে ৮০ টাকা, টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

প্রতিটি পিস ফুলকপি ও বাঁধাকপি আকার ও বাজারভেদে ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে যশোর শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড কাঁচাবাজারে খুচরা পর্যায়েই প্রতি কেজি পেঁপে ১০ টাকা, পটল ২৫ টাকা, টমেটো ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং বেগুন ৭০ থেকে ৮০ টাকা ও বাঁধাকপি ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

কাওরানবাজারে কেনাকাটা করে আমজাদ হোসেন বলেন, ‘বেশিরভাগ সবজির দামই ১০০ টাকার আশপাশে। শীত এলে সাধারণত সবজির দাম কমার কথা, কিন্তু এবার দেখছি উল্টো চিত্র। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সবজি কেনা এখনও কঠিন।’

উত্তরে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, নওগাঁ, গাইবান্ধা থেকে প্রতিদিন সবজি আসে ঢাকায়। ট্রাকে করে ঢাকার আড়তে আসার পর সেখান থেকে কিনে নেন পাইকারি বিক্রেতারা, তাদের কাছ থেকে কেনেন খুচরা বিক্রেতারা। অনেক সময় খুচরা বিক্রেতারাও আড়ত থেকে কিনে নেন।

কৃষকরা কখনও মফস্বলে বড় বড় বাজারে ভ্যানে করে সবজি নিয়ে যান, কখনও স্থানীয় সংগ্রহকারীরা কৃষকদের কাছে সরাসরি কিনে আনে।

প্রতিটি হাতবদলে সবজির দাম বাড়ে, তবে যদি সরবরাহ বেশি থাকে, সেদিন পাইকারিতে অনেক সময় কমেও যায়। তবে যেটি মোটামুটি স্থির, সেটি হলো পরিবহন, শ্রমিক, বাজারে করসহ নানা খরচ ও ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি।

কাওরানবাজারের যমুনা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘আড়ত থেকে আমাদের কাছে কোনো পণ্য আসার পর এটা কখনও একটা হাত ঘুরে আবার কখনও দুইটা হাত ঘুরে সাধারণ মানুষের হাতে যায়। এই দুইটা হাত ঘুরলে ঢাকাতেই একটা পণ্যের দাম ১০-১৫ টাকা বাড়ে।’

কাওরান বাজারের আড়তদার আবদুল গণি টাইমসকে বলেন, ‘একটা কাঁচামালের রং, রূপ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিবর্তন হয়ে যায়। কখনো পাঁচ মণ সবজি কিনলে বিক্রি করতে করতে এক মণ নষ্ট হয়ে যায়। সে কারণে খুচরা ব্যবসায়ীরা ওই নষ্ট হয়ে যাওয়া সবজির দাম সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে তুলে নেন’

আড়তদাররা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর ট্রাক ভাড়া বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির মতে, মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের লাভ নিশ্চিত করতে হলে পণ্য সরাসরি বাজারে পৌঁছাতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে কৃষকের উৎপাদন খরচ, হারভেস্টিং খরচ কত হচ্ছে এগুলো পর্যবেক্ষণ করে কোন পণ্যের দাম কত হবে সেটা বেঁধে দিতে হবে। এরপর একটা পণ্য পাইকার কত বিক্রি করবেন, সাধারণ মানুষ কতদামে ক্রয় করবেন এগুলোও ঠিক করে দিতে হবে। এতে করে বাজারে পণ্যের দামের অস্থিরতা কমবে।

বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি মো. ইমরান মাস্টার টাইমকে বলেন, ‘আমরা তো এখন অনেক আপডেট হয়েছি। সারা দেশে যত আড়তদার আছেন সবাই মিলে একটা সেট্রাল প্ল্যাটফর্মে মিলিত হতে হবে, সরকারকে একটা কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। এতে করে আড়তদাররা কোন জেলাতে, কোন কৃষক কোন পণ্য উৎপাদন করছেন এটা দেখে সরাসরি ওই কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাজারে পণ্য নিয়ে আসতে পারবেন। এতে করে হাতগুলো বদল হওয়া বন্ধ হবে এবং কৃষক, পাইকার, সাধারণ ক্রেতা সবাই লাভবান হবেন।’

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বাজার শাখার উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘কৃষকের পণ্য সরাসরি ঢাকার বাজারে আনতে পারলে ভালো হতো। তবে কাজটা কঠিন। সে ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে পণ্যের দাম ঠিক রাখতে একটা পণ্য ঢাকার বাজার পর্যন্ত আসতে যে কয়েকটা অযৌক্তিক হাত বদল হয়, সেগুলো বন্ধ করতে পারলে পণ্যের দাম অনেকটাই কমে যাবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad