স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশ এখন বাড়তি তিন বছর সময় পেয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রস্তুতির সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করেছে।
তবে এই সময় বাড়ানোর সঙ্গে একটি স্পষ্ট প্রত্যাশাও রয়েছে। তা হলো, বাড়তি সময়ে দেশের ভেতরে কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। উত্তরণ হতে হবে মসৃণ ও টেকসই, যাতে দেশকে আর পেছনে ফিরতে না হয়। প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময় গ্রুপ অব ৭৭ ও চীনও জোর দিয়ে বলেছে, উত্তরণের প্রক্রিয়ায় উন্নয়নের অর্জনগুলো ধরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে বর্ধিত সময়ে অভ্যন্তরীণ সংস্কারে বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হবে।
এর ফলে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলো আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ভবিষ্যতে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা হারানোর ধাক্কা সামাল দিতে আমাদের বিকল্প বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বাড়তি তিন বছর পাওয়ায় এই সুবিধা হারানোর প্রস্তুতির তাগিদ যেন কমে না যায়।
আমাদের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্য অর্থনীতিগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। যেমন ভিয়েতনাম আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিগুলো কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতি, মেধাস্বত্ব ও শ্রম আইনও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
নেপাল এ ক্ষেত্রে আরেকটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। দেশটি নিজেদের উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে বাণিজ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কার করছে এবং আঞ্চলিক অবকাঠামো শক্তিশালী করছে। বাংলাদেশকেও একইভাবে মসৃণ উত্তরণের কৌশল তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই কৌশলে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার থাকতে হবে, যাতে উত্তরণ টেকসই হয় এবং দেশকে আর পেছনে ফিরতে না হয়।
তাই বাড়তি তিন বছর সংস্কার পিছিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বাস্তবায়নের জন্য কাজে লাগাতে হবে।
তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি বড় দুর্বলতা। অর্থনীতির কাঠামোয় অর্থবহ পরিবর্তন আনতে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হবে।
একই সঙ্গে নির্দিষ্ট উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে দেশের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো—দুই ক্ষেত্রেই এটি জরুরি।
চ্যালেঞ্জ শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়।উত্তরণের পর সহজ শর্তে উন্নয়ন অর্থায়ন কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশকে সরকারি আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, সরকারি ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও উন্নত করতে হবে এবং করের আওতা বাড়াতে হবে। বাইরের ধাক্কা থেকে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে এসব পদক্ষেপ অপরিহার্য।
উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময় পেয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কারের গতিপথ বদলায়নি।
দেশের এখনো বিকল্প বাজারে প্রবেশের সুযোগ, বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, পোশাকের বাইরেও রপ্তানিতে বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতায় বেশি বিনিয়োগ, উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক বাজারের জন্য প্রস্তুত কর্মীবাহিনী এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্বের শক্তিশালী ভিত্তি প্রয়োজন।
এখন কাজ হলো বাড়তি তিন বছরে এসব পরিবর্তন আনা, যাতে ২০২৯ সালে বাংলাদেশের উত্তরণ টেকসই হয় এবং দেশকে আর পেছনে ফিরতে না হয়।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ


