‘চীনা স্বৈরশাসক’ মন্তব্যে বিপাকে এমবাপ্পে

‘চীনা স্বৈরশাসক’ মন্তব্যে বিপাকে এমবাপ্পে
ছবি: এএফপি/ বাসস
Advertisement
Advertisement

ফুটবল মাঠে গোল করে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করা কিলিয়ান এমবাপ্পে এবার নিজেই পড়েছেন গোলমেলে পরিস্থিতিতে। চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংকে ঘিরে করা এক মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছেন দেশটির ফুটবলপ্রেমীরা। তাতে শুধু সমর্থকদের রোষানলেই পড়েননি, হারিয়েছেন দুটি বড় চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও।

পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চাইতে হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকাকে।

ঘটনার সূত্রপাত একটি ভিডিওকে ঘিরে। সেখানে সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এমবাপ্পেকে নিজের মুখ ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অন্য একজনের শরীরে বসানো একটি ইন্টারনেট মিম নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি বলেন, তার দেখা সবচেয়ে মজার মিমটিতে তার মুখ বসানো হয়েছিল ‘কোনো এক লোকের’ শরীরে, যিনি চীনের “স্বৈরশাসক” বলে তার ধারণা। ভিডিওতে মাওয়ের নাম সরাসরি উচ্চারণ না করলেও মন্তব্যটি তাকে ইঙ্গিত করেই করা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়, ভিডিওটি গত এপ্রিলে ধারণ করা হয়েছিল। ফরাসি ফুটবল পডকাস্ট ‘দ্য ব্রিজ’ ক্লিপটি প্রকাশ করার পর সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই শুরু হয় বিতর্ক।

বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি দেন ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পে। ফরাসি, ম্যান্ডারিন ও ইংরেজি, তিন ভাষায় প্রকাশিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমার মন্তব্যটি ছিল অপরিণামদর্শী। এখন বুঝতে পারছি, এতে চীনের অনেক মানুষ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা চীনা সম্প্রদায়ের অনেকে কষ্ট পেয়েছেন।’

নিজের একটি ছবি দেখে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন উল্লেখ করে এমবাপ্পে আরও বলেন, ‘আমার কথায় যারা কষ্ট পেয়েছেন, তাদের সবার কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। কাউকে আঘাত করা মোটেও আমার উদ্দেশ্য ছিল না। চীনের জনগণ ও তাদের ইতিহাসের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’

তবে ক্ষমা চাইলেও এরই মধ্যে এমবাপ্পের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে চীনের পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডংপেং। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করে এমবাপ্পের সঙ্গে তাদের চুক্তি শেষ করা হয়েছে। জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন আচরণের বিরুদ্ধে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

আরও পড়ুন

এমবাপ্পের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে চীনের বৃহত্তম দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউও। অথচ এবারের ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালে চীনে ডংপেংয়ের স্পোর্টস ড্রিংক হাতে এমবাপ্পের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিজ্ঞাপনচিত্র নিয়মিত দেখা গেছে। মাঠের পারফরম্যান্সের কারণে চীনা ভক্তদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় এই তারকার জন্য তাই বাণিজ্যিক ধাক্কাটিও কম নয়।

বিতর্কের রেশ ছড়িয়েছে স্প্যানিশ ফুটবল লিগ লা লিগাতেও। এমবাপ্পের মন্তব্যের জেরে চীনা ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে সংস্থাটি। তাদের বক্তব্য, মন্তব্যটি এমবাপ্পে ব্যক্তিগতভাবে করেছেন, এর সঙ্গে লা লিগা সম্পৃক্ত নয়।

লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাসও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। চীনে এই মন্তব্যে যে অস্বস্তি ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে সংস্থাটি গভীরভাবে অনুতপ্ত বলে জানান তিনি। চীনা অংশীদারদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তেবাস। তার কথায়, ‘এত বছরের সম্পর্ক একটি ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না।’

চীনে মাও সেতুংকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যকে অসম্মানজনক হিসেবে দেখা হয়। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন মাও। ফলে তাকে ঘিরে এমন মন্তব্য দেশটিতে সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘চায়না ডেইলি’ বলেছে, ইন্টারনেটের একটি মিম নিয়ে মন্তব্য এমবাপ্পের চীনা সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করেছে, তার লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলেছে ।

রাষ্ট্রসমর্থিত ‘গ্লোবাল টাইমস’ও মন্তব্যটির সমালোচনা করেছে। সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, অনেক চীনা নাগরিকই ঠিক কী বলা হয়েছে, তা পুনরাবৃত্তি করতে চান না। চীনা ভোক্তাদের বার্তা স্পষ্ট, শ্রদ্ধা দেখানো ঐচ্ছিক নয়; চীনকে অসম্মান করে এ দেশের বাজার থেকে মুনাফা করার সুযোগ নেই।

এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন লা লিগা ও এমবাপ্পে সংশ্লিষ্ট সব ম্যাচ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ রেখেছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রসমর্থিত সংবাদমাধ্যম ‘দ্য পেপার’। এমবাপ্পেকে নিয়ে বিজ্ঞাপনও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৭টা পর্যন্ত চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে আলোচিত শীর্ষ ১০ বিষয়ের মধ্যে এমবাপ্পেকে ঘিরে চারটি বিষয় ছিল। কেউ কেউ তাকে চীনে ‘ব্ল্যাক লিস্ট’ করে বাণিজ্যিক মূল্য শূন্যে নামিয়ে আনার দাবিও জানিয়েছেন।

এ ঘটনায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন কথা বা আচরণের বিরুদ্ধে দেশটির সমাজের বিভিন্ন মহল স্বাভাবিকভাবেই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad