প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সাংবাদিক, গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা।
তারা বলেছেন, সাইবার অপরাধ ও অপতথ্য দমনের নামে সাংবাদিকদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচার কিংবা সংবাদমাধ্যম বন্ধের সুযোগ রাখা উচিত নয়। মানহানির অভিযোগ মোকাবিলায় প্রচলিত আইন কার্যকর করারও আহ্বান জানান তারা।
রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। টিআইবি, ব্র্যাক, ব্লাস্ট, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ ১৯টি সংগঠন যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে।
সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সাইবার অপরাধ দমনে আইন প্রয়োজন। তবে সরকারের সমালোচনা ও সাইবার অপরাধের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা থাকবেই।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের হাত বাঁধবেন না, বাঁধলে লিখতে পারব না। পরে আমাদের কাছেই আপনাকে আবার আসতে হবে।’
প্রস্তাবিত আইনে সাংবাদিকদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচারের বিধানের বিরোধিতা করে মতিউর রহমান বলেন, ‘ভেজাল ওষুধ যারা তৈরি করেন, তাদের ধরার জন্য যে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ব্যবহার করা হয়, সেই আদালতের কাছে আপনি সাংবাদিকের বিচারের ক্ষমতা দিচ্ছেন! এইটা কী করে একটা গণতান্ত্রিক সমাজে চিন্তা করা যেতে পারে?’
কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায়ে সংবাদপত্র বা অনলাইন সংবাদমাধ্যম বন্ধের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার আশঙ্কা, অপছন্দের সংবাদকে ভুল তথ্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো ভুল তথ্য শনাক্তের প্রক্রিয়া স্পষ্ট করার আহ্বান জানান তিনি।
আইন চূড়ান্ত করার আগে বিভিন্ন জেলায় আলোচনা আয়োজন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার পরামর্শ দেন মতিউর রহমান। আইনটি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবিত আইনে বাক্স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ডিজিটাল অধিকার, গণমাধ্যমের কার্যক্রম ও অপতথ্য নিয়ন্ত্রণ একই আইনের আওতায় আনলে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, অপতথ্য মোকাবিলায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সহযোগিতা, তথ্য যাচাইয়ের মানদণ্ড, অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমকর্মী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের যুক্ত করার আহ্বান জানান ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, অপতথ্য দমনের উদ্যোগ যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার হাতিয়ার না হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রেস সচিব ও ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে মানহানির অভিযোগ মোকাবিলায় সাইবার আইনের পরিবর্তে প্রচলিত মানহানি আইন কার্যকর করা উচিত। সাইবার আইনে এসব অপরাধের বিচার হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ইচ্ছাকৃত মিথ্যা সংবাদ ও চরিত্রহানির ঘটনায় আর্থিক জরিমানাসহ কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
শফিকুল আলম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাপক পরামর্শের ভিত্তিতে আইনটি প্রণয়ন করেছিল। বর্তমান সরকার কেন আইনটি সংশোধন করতে চাইছে, তা বোঝা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও মতামত প্রকাশ এবং ইউটিউবার ও প্রভাবশালীদের বিপুল অনুসারীর কারণে নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তাদের বক্তব্য সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় আইন নিয়ে আলোচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
সাংবাদিক শরীফুজ্জামান পিন্টু বলেন, সাইবার অপরাধ থেকে সুরক্ষার নামে মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, ‘সুরক্ষা দেওয়ার নামে যদি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় কিংবা মতপ্রকাশ ও মতামতের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়, তাহলে তা আমাদের আরেকটি বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে।’


