দায়িত্বহীনতার দৃশ্যপটে দায়বদ্ধতার সংকট

দায়িত্বহীনতার দৃশ্যপটে দায়বদ্ধতার সংকট
Advertisement
Advertisement

শনিবার সংবাদমাধ্যমের অনলাইনে প্রচার হওয়া তিনটি ঘটনা একসঙ্গে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে রাষ্ট্র পরিচালনার এক বিরূপ চিত্র। প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক নগর পরিদর্শন, প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান এবং ইনানী বিচের রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে দশ পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যু—এই তিন ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে আলাদা হলেও এদের অন্তর্নিহিত সূত্র একটাই: প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার অভাব ও সংকটকালে অগ্রাধিকার নির্ধারণে বিভ্রাট।

প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক নগর পরিদর্শনের ঘটনা নতুন নয়। প্রায়শই তিনি এমন পরিদর্শনে যান, কিন্তু এবারের অভিযান ব্যাপকতর ছিল এবং প্রায় প্রতিটি স্থাপনায় অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। শিশু হাসপাতালে ধূমপানরত চিকিৎসককে তাৎক্ষণিক শাস্তির আওতায় আনা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন চিকিৎসকের অসদাচরণ ধরা পড়ল, শাস্তি হলো; কিন্তু যে অব্যবস্থাপনা, অপরিচ্ছন্নতা ও দুর্গন্ধ দীর্ঘদিনের চর্চা, তার দায় কার? সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধান, অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কিংবা মন্ত্রীর দায় কোথায়? প্রধানমন্ত্রী যদি সশরীরে গিয়ে এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহর সময়সীমা বেঁধে দিতে হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে—নিয়মিত তদারকি ব্যবস্থা কী কাজ করছে? আইন ও বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও এসব অনিয়ম দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার অর্থ হলো দায়িত্বপ্রাপ্তরা হয় অক্ষম, নয়তো উদাসীন, কিংবা তাদের সঙ্গে কোনো অনিয়মের যোগসাজশ রয়েছে। বৈশ্বিক ক্রান্তিকালে যখন দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজে সময় ও শক্তি ব্যয় করা জরুরি, তখন স্টাফ কোয়ার্টার সাবলেট দেওয়ার মতো ঠুনকো বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে মাঠে নামতে হওয়া প্রশাসনিক ব্যর্থতারই প্রমাণ। শাস্তি যদি হয়, তবে তা কেবল একজন ধূমপায়ী চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; অবহেলার দায়ে অভিযানের সঙ্গী দায়িত্বশীলদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয় ঘটনা—প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে মাদক বিরোধী অভিযান আরও উদ্বেগজনক। মাদক নির্মূল করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ, কিন্তু রাষ্ট্রের এ কাজের জন্য রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশসহ যথোপযুক্ত সংস্থা। যার কাজ তার ওপরই ন্যস্ত করা এবং সেই কাজে ব্যর্থদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা—এটাই দক্ষ প্রশাসনের বৈশিষ্ট। ফিল্মি কায়দায় প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে দৌড়াদৌড়ি সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করলেও তা রাষ্ট্রের জন্য সুখকর দৃশ্য নয়; বরং এটি আরও বিশৃঙ্খলার দৃশ্যমানতা তৈরি করে এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি অবিশ্বাসের বার্তা ছড়ায়। একজন প্রতিমন্ত্রীর নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে এভাবে মাঠে নামা কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলারও প্রশ্ন।

তৃতীয় ঘটনা ইনানীর রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে দশ পর্যটকের মৃত্যু—সবচেয়ে মর্মান্তিক ও লজ্জাজনক। জানা যাচ্ছে, রিসোর্টটির অনুমোদন ছিল না এবং গত জুন মাসেই ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় সতর্ক করেছিল। সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি নিয়ে পরিচালিত হতে পারে, তবে তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার চরম ব্যর্থতা। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন, ফিটনেস বা লাইসেন্সের অভাব নিয়ে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দুর্ঘটনা ঘটার আগেই অনুনোমোদিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সাধারণ মানুষের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম দায়িত্ব।

জনপ্রিয় কথায় মিডিয়ায় তাৎক্ষণিক বাহবা পাওয়া যায়, কিন্তু সত্যিকারের জনসেবা ও দেশোন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন যার যে দায়িত্ব, তাকে তা পালনে বাধ্য করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নগর পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সিরিয়াস আগ্রহ বিভিন্ন সময়ের কর্মতৎপরতায় ফুটে উঠেছে—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সাংবিধানিক ও আইনানুগভাবে নগর পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়রদের মাধ্যমে এ কাজ সম্পন্ন করাটাই হবে প্রকৃত সফলতা। তেমনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ হবে অবৈধ মাদকের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করা। রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গে দায়বদ্ধতার শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠিত হলে তবেই আকস্মিক পরিদর্শন, ফিল্মি অভিযান কিংবা মৃত্যুর পর তদন্ত কমিটি গঠনের সংস্কৃতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। আমরা এমন রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা দেখতে চাই, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজ নিজ অবস্থান থেকেই দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবেন এবং অবহেলার দায় এড়ানোর সুযোগ না পাবে। দায়বদ্ধতাই হোক আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।

লেখক: নাহিদ হোসেন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, টাইমস অব বাংলাদেশ

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad