রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলে রাতভর রেকর্ডসংখ্যক ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।
অন্যদিকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা আবার শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
রাশিয়ার অভিযোগ, ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র রিয়াজান অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে আঘাত হেনেছে। ট্রাম্পের ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার পর ওই স্থাপনায় এটিই ইউক্রেনের প্রথম হামলা বলে দাবি করেছে মস্কো। তবে দুই দেশের কেউই এ যুদ্ধবিরতিতে সম্মতির কথা জানায়নি।
রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে জেলেনস্কির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। তার দাবি, এসব হামলার কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বেড়েছে।
বুধবার জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা আবার শুরু করবে ইউক্রেন। শান্তি আলোচনায় আগ্রহ দেখাতে সাময়িকভাবে এসব হামলা বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে তিনি বলেন, ‘শোধনাগারে হামলার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমরা শেষ করেছি।’ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে ঘাটতিকেও ‘বিপজ্জনক’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রিয়াজানের তেল শোধনাগারে আগুন লাগার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দাবি, স্থাপনাটিকে লক্ষ্য করে ৬৯টি ড্রোন ও চারটি ফ্লামিঙ্গো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। রুশ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, আকাশ প্রতিরক্ষার গুলিতে ভূপাতিত একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ শোধনাগারে পড়ে আগুন লাগে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলীয় কিরোভোহরাদ অঞ্চলে ৩৬০টির বেশি রুশ ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এ হামলায় তিনজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর তুলনায় এ অঞ্চলে আগে হামলার তীব্রতা কম ছিল।
আঞ্চলিক গভর্নর আন্দ্রি রাইকোভিচ বলেন, ‘শত্রুপক্ষ পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, পরিবহন প্রতিষ্ঠান, সরবরাহব্যবস্থা ও আবাসিক বাড়িতে হামলা চালিয়েছে।’
জেলেনস্কির দাবি, রাশিয়া ইউক্রেনে ৮৫০টির বেশি শাহেদ ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাসক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা ‘কৃত্রিমভাবে সীমিত’ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ব্যবহারে সাম্প্রতিক বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ টানেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পর এবং ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা দেখে রাশিয়া যে পরিকল্পিতভাবে হামলা বাড়িয়েছে, তা স্পষ্ট।’ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বিরোধের মধ্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেনের ধারাবাহিক সমর্থন প্রয়োজন, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে। এই যুদ্ধ নিয়ে আমাদের অংশীদারদের কাছ থেকে সততা প্রয়োজন। আমেরিকার সবার উচিত আগ্রাসীর পাশে না দাঁড়িয়ে জীবন রক্ষা, যুদ্ধের অবসান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় ইউক্রেনের পাশে থাকা।’
গত সপ্তাহে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করেন। তিনি লেখেন, ‘অবিলম্বে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জ্বালানি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে। দুই পক্ষ এতে সম্মত হয়েছে। এটি ভাঙবেন না!’
তবে এ ঘোষণার পরও রাশিয়া ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এতে রাজধানী কিয়েভসহ কয়েকটি শহরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বন্ধ থাকে। এর মধ্যে আলোচনায় আগ্রহের প্রমাণ দিতে ইউক্রেন সাময়িকভাবে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ রেখেছিল।
ইউক্রেনকে রাশিয়ার শর্ত মেনে নিতে চাপ দিতে অস্ত্র সরবরাহের কর্মসূচি বন্ধ করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রসংক্রান্ত মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধের হুমকি দেয় হোয়াইট হাউস।
যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি হুমকি বাস্তবায়ন করেছে বলে দাবি করেছে ইউক্রেন। দেশটির ভাষ্য, চলতি সপ্তাহে কয়েক দিন ধরে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে ওয়াশিংটন আগাম সতর্কতা দেয়নি। বুধবার ইউক্রেনের সেনারা অভিযোগ করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন স্টারশিল্ড ব্যবহারে তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এতে সম্মুখযুদ্ধে ড্রোন অভিযান ব্যাহত হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। ট্রাম্প মনে করেন, ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার বিনিময়ে দেশটির নেতৃত্বের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। তিনি ইউক্রেনে ‘নতুন প্রেসিডেন্ট আনা উচিত’ বলেও মন্তব্য করেছেন।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কিকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি নিজেকে প্রতারিত মনে করছেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ। তিনি আরও বলেন, ‘দুঃখজনক যে আমরা একজন শক্তিশালী অংশীদারকে হারাচ্ছি।’
এদিকে, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী স্টারলিংক টার্মিনাল ব্যবহার করে। এসব টার্মিনাল তৈরি করে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। যুক্তরাষ্ট্রে জেলেনস্কির অন্যতম সমালোচক হয়ে উঠেছেন মাস্ক।
বৃহস্পতিবার স্টারলিংক সেবা সীমিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেন মাস্ক। তার দাবি, ব্যবস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। তবে রাশিয়ার পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, জেলেনস্কির এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘এভাবেই হত্যাযজ্ঞ চলতে থাকবে… জেলেনস্কির বিদায় নেওয়ার সময় হয়েছে।’


