মাগুরায় নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেন, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ক্ষোভ প্রকাশের বিভিন্ন ভিডিও, পোস্ট ও একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে শালিখা উপজেলার আড়পাড়ায় মঙ্গলবার স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে তিনজন আহত হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওতে শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুল আলম হিরোকে টাকা না দিলে ডিলার নিয়োগের জন্য কারও নাম জেলায় পাঠানো হয়নি, এমন কথা বলতে শোনা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। অডিওতে বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত রঞ্জু আহমেদ পরে এ বক্তব্য অস্বীকার করে এটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বলে দাবি করেছেন।
নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন কামরুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী। ভিডিওতে তিনি কটাক্ষ বলেন, মাগুরায় যারা সার ডিলারশিপ পেয়েছেন, তারা সবাই বিএনপির ত্যাগী নেতা, এতে তিনি খুশি। তবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা এসব নেতাকে আগে থেকেই চিনতেন কি না, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। ৫৯৬ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জনপ্রতি দুই হাজার টাকা করে প্রায় ১২ লাখ টাকা নেওয়ার প্রয়োজন কেন হলো। ত্যাগী নেতাদের ডেকে সরাসরি ডিলারশিপ দেওয়া যেত কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা কেন বাদ পড়েছেন, তা জেলা প্রশাসকের কাছে স্পষ্ট করার দাবি জানান কামরুল।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাগুরার ৩৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার জন্য নতুন ৩৭ জন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এ জন্য আবেদন করেছিলেন ৫৯৬ জন। জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ জানিয়েছেন, নীতিমালা অনুসরণ করে আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার জন্য তিনজন করে প্রার্থীর নাম সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
তবে তালিকা প্রকাশের পর প্রার্থী নির্বাচনের মানদণ্ড ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সুপারিশ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পছন্দও প্রার্থী নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছে। কোথাও কোথাও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মাগুরা পৌর যুবদলের সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মহম্মদপুর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শরিফুজ্জামান টুকুও বালিদিয়া ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া ডিলারকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন। পৌরসভার ডিলার নিয়োগে পরিবারের একজনের আবেদন যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুকুজ্জামান ফারুক। ডিলার নির্বাচনে যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ড কী ছিল এবং প্রার্থীদের কীভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, তা তিনি প্রশ্ন তোলেন।
সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গলবার দুপুরে শালিখা উপজেলা সদর আড়পাড়ায় স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে রানা, আলিম ও রসুল নামে তিনজন আহত হন। শালিখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানিয়েছেন, পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছে।
জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ বলেন, ৫৯৬ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে নীতিমালা অনুসারে যাচাই-বাছাই করে প্রার্থীদের তালিকা সুপারিশ করা হয়েছিল। শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হাসান চৌধুরী স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, এটি প্রাথমিক তালিকা। তালিকায় বিতর্কিত কেউ থাকলে যাচাই-বাছাই করে বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. মনোয়ার হোসেন খানও তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলেছেন। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আলী আহম্মেদ জানান, তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তির নাম থাকায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং দলের কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তবে অর্থ লেনদেন, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মাগুরা জেলা শাখার আহ্বায়ক ও দুর্নীতিবিরোধী গণকমিটির সদস্যসচিব প্রকৌশলী শম্পা বসু বলেন, কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্যে সঠিক সময়ে সার পাওয়া জরুরি। সার ডিলার নিয়োগ দলীয়করণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রভাবিত হলে কৃষকদের সার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অতীতে এসব কারণে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি এবং কৃষকদের সময়মতো সার না পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


