রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ২০২৪ সালের ২০ জুলাই এপিসি থেকে বৃষ্টির মতো গুলি চালাচ্ছিল পুলিশ। এমন পরিস্থিতিতে কাজলার একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নেওয়া ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়াকে দোকান থেকে ধরে নিয়ে গুলি করা হয় বলে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে তাইম হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে আদালতে হত্যার ভিডিও এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পুলিশের এক কর্মকর্তার কথোপকথনও উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ।
প্রসিকিউশন প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি তুলে ধরে জানায়, ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকায় শত শত পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন। এপিসি থেকে পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি চালাচ্ছিল। এ পরিস্থিতি দেখে তাইম ও তার বন্ধুরা যাত্রাবাড়ীর পূর্বদিকে কাজলার একটি চায়ের দোকানে চা খেতে যায়।
কিছুক্ষণ পর দোকানের কাছে ২৫ থেকে ৩০ জন পুলিশ সদস্য জড়ো হন। তাদের দেখে তাইম ও তার বন্ধুরা দোকানের শাটার নামিয়ে দেয়। এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য বলেন, এদের ক্রসফায়ার করে দিই।
পুলিশ শাটার খুলতে বললেও তারা তা খোলেনি। পরে পুলিশ শাটার খুলে তাইমকে ধরে নিয়ে যায়। এ সময় এক পুলিশ সদস্য তার বাম পায়ে ও কোমরের কাছে গুলি করেন বলে সাক্ষীর জবানবন্দির বরাতে আদালতে জানায় প্রসিকিউশন।
প্রসিকিউশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ওই সময় পুলিশ দোকান থেকে বিভিন্ন মালামাল লুট করে। এর মধ্যে ২৫ হাজার টাকার সিগারেটও ছিল।
তাইমকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তার বন্ধু ও মামলার সাক্ষী শাহরিয়ার। তবে পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিতে দেয়নি বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ শাহরিয়ারকে বলেছিল, মরবি, নাকি যাবি? পিছনে তাকাবি না, দৌড় দে।
হত্যার ভিডিও প্রদর্শন
যুক্তিতর্কে প্রসিকিউশন জানায়, তাইম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন এবং এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান। তাদের মধ্যে দুজনের ভিডিও এবং একজনের স্থিরচিত্র আদালতে প্রদর্শন করা হয়।
প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভিডিওতে তাদের গুলি চালাতে দেখা যায়। পালানোর চেষ্টা করা এক আন্দোলনকারীকেও গুলি করা হয় বলে যুক্তিতর্কে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে রাহাত, লিটন ও শাহরিয়ারের সাক্ষ্য তুলে ধরে প্রসিকিউশন জানায়, তিনজনের বর্ণনায় সামঞ্জস্য রয়েছে। তাদের জবানবন্দির বরাতে আরও বলা হয়, ২০ জুলাই জাকির ১৯৬ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিলেন এবং মামুন পিস্তল থেকে দুই রাউন্ড গুলি করেছিলেন।
আদালতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে ডিসি ইকবাল হোসাইনের কথোপকথনের একটি ভিডিও চালানো হয়। এতে ‘একটা গুলি করি, একটাই যায়, বাকিডি যায় না, স্যার’ এমন কথা শোনা যায় বলে প্রসিকিউশন জানায়। এ ছাড়া তাইমকে গুলি করার ভিডিও এবং সাজ্জাদের স্থিরচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
তাইমের বাবা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তাইমকে হত্যা করে পুলিশ। ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তার বন্ধু রাহাতকেও গুলি করা হয়।
১১ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার ২
মামলার ১১ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন দুজন। তারা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান এবং সাবেক এসআই শাহদাত আলী।
অন্য নয় আসামি পলাতক। তারা হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক উপকমিশনার (ডিসি) ইকবাল হোসাইন, অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন এবং এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।
এর আগে গত ২২ ফেব্রুয়ারি এ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।


