ঢাকা থেকে পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সড়কপথে ইউরেনিয়াম জ্বালানি পরিবহনের পদ্ধতি ও আগাম প্রচার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন পরমাণু বিজ্ঞানীরা।
তারা বলছেন, সড়কপথে এই জ্বালানি নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে যেমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে, তেমনি পরিবহন খবর আগেভাগে জানাজানি হলে নাশকতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাশিয়া থেকে আসা ইউরেনিয়ামের সর্বশেষ চালানটি গত ৩ অক্টোবর ঢাকা থেকে ২১৬ কিলোমিটার দূরের রূপপুরে পাঠানো হয়। সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় তিনটি কাভার্ডভ্যানে করে এগুলো নেওয়া হয়।
ওই গাড়িবহরে থাকা এক সরকারি কর্মকর্তা টাইমসকে জানান, জ্বালানি নেওয়ার সময় কড়া নিরাপত্তা দেওয়া হয়। পুরো রাস্তায় সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পাহারা দেন। যাত্রাপথে সাধারণ গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে এবং রাস্তার পাশের দোকানপাট-বাজারে মানুষের চলাফেরা সীমিত রাখা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশে অত্যন্ত গোপনে ইউরেনিয়াম নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বিষয়টি বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হয়, এমনকি টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই প্রচারের কারণে কোনো দুষ্কৃতকারী গোষ্ঠী হামলার সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। যদি কোনো গোষ্ঠী নাশকতা চালাতে চায়, তবে তারা সহজেই পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলতে পারবে। এমন কিছু ঘটে গেলে বাংলাদেশের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হবে এবং বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।’
তিনি জ্বালানি পরিবহনের সময় গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি চালুর পরামর্শ দেন, যাতে জ্বালানি বহনকারী বিমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছেই নামতে পারে।
তিনি বলেন, ‘সরকার যদি মনে করে শুধু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়ে ফেললেই দায়িত্ব শেষ, তবে ভুল হবে। ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি উন্নত করতে হবে, যেন ইউরেনিয়ামবাহী বিমান সরাসরি সেখানেই নামতে পারে।’
ঢাকা থেকে রূপপুর যাওয়ার সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার ওই যাত্রায় সঙ্গে থাকা এক সরকারি পরমাণু বিজ্ঞানী জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু রাখতে প্রতি বছরই জ্বালানি আনতে হবে। আবার কয়েক বছর পর ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় ফেরত পাঠাতে হবে। তাই আকাশপথে এটি পরিবহনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা দরকার।
রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরেই ঈশ্বরদীতে একটি অব্যবহৃত বিমানবন্দর রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার এটি তৈরি করেছিল। তখন এর নাম ছিল ‘হিজলী বেস এরিয়া’। ১৯৪৫ সালে মার্কিন বিমান বাহিনী এটি ব্যবহার করত। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স প্রথম সেখানে যাত্রীবাহী বিমান চালায়। স্বাধীনতার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা-ঈশ্বরদী রুটে বিমান চালিয়েছিল। পরে ২০১৩ সালে বেসরকারি সংস্থা ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ রুটটি চালু করলেও এক বছরের মাথায় তা বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, বিমানবন্দরটি সংস্কার করা সম্ভব। বড় বিমান চলাচলের উপযোগী করতে এর রানওয়ে ও অন্যান্য সুবিধা নতুন করে তৈরি করতে হবে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান টাইমসকে বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলো লাভজনক নয়, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আয় দিয়েই এগুলো চলে। তবে তিনি যোগ করেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি পরিবহনের জন্য বিমানবন্দরটি চালু করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সরকারের।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


