বাগেরহাটের শরণখোলায় ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসির এক এজেন্ট দেড় শতাধিক গ্রাহকের প্রায় ৫ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছেন। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রাহকদের হাতে থাকা বেশিরভাগ জমার রসিদই ভুয়া, আর মোবাইলে পাঠানো লেনদেনের বার্তাগুলোও ব্যাংকের আসল বার্তা ছিল না।
তাফালবাড়ী বাজারে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট পরিচালনা করতেন মো. ওমর ফারুক রাজু। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই।
রাজুর নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিপুল অঙ্কের টাকা হারানোর আশঙ্কায় পড়েছেন গ্রাহকেরা। তাদের অনেকে বলছেন, বেশি লাভের প্রতিশ্রুতিতে জীবনের শেষ সঞ্চয়ও ওই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে জমা রেখেছিলেন।
ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ১ অক্টোবর আউটলেটটি পরিদর্শন করে সেটি বন্ধ ঘোষণা করেন এবং সামনে নোটিশ টানিয়ে দেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ব্যাংকের জেলা কার্যালয়ে অভিযোগ করতে বলা হয়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা শরণখোলা থানায় সাধারণ ডায়েরির (জিডি) আবেদন করেছেন।
গ্রাহকদের অভিযোগ, রাজু তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের সিল দেওয়া ডিপোজিট স্লিপ দিতেন। নিজের মোবাইল ফোন থেকে গ্রাহকদের ফোনে টাকা জমার এসএমএসও পাঠাতেন।
গ্রাহকেরা বলছেন, ওই রসিদ ও বার্তা যে ভুয়া, তা বোঝার কোনো উপায় তাদের ছিল না। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ পদ্ধতিতে দেড় শতাধিক মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা নেওয়ার পর রাজু আত্মগোপনে চলে যান।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, রাজু বাংলাদেশ ছেড়ে নেপালে গেছেন এবং সেখান থেকে ইউরোপে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তবে টাইমস এ তথ্য যাচাই করতে পারেনি।
রাজুর পরিবার বলছে, তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তারা কিছু জানে না। রাজু দক্ষিণখালী ইউনিয়নের পূর্ব সোনাতলা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. শাহ আলম হাওলাদারের ছেলে। ২০২১ সালে তাফালবাড়ী বাজারে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিচিতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা অর্জন করেন রাজু। পরে আমানতের বিপরীতে অস্বাভাবিক হারে লাভ দেওয়ার প্রস্তাব দিতে শুরু করেন।
গ্রাহকদের দাবি, প্রতি ১ লাখ টাকা জমা রাখলে মাসে ২ হাজার টাকা লাভ দেওয়ার কথা বলতেন রাজু, যা ব্যাংকের প্রকৃত সুদের প্রায় দ্বিগুণ। বেশি লাভের আশায় অনেকে তার কাছে টাকা জমা রাখতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ জীবনের শেষ সঞ্চয়ও জমা রেখেছিলেন।
ভুক্তভোগী আ. খালেক পঞ্চায়েত বলেন, তার ৩৫ লাখ টাকা ওই আউটলেটে জমা ছিল। টাকা জমা দেওয়ার পর তাকে একটি স্লিপ দেওয়া হয়েছিল, যা পরে তিনি ভুয়া বলে জানতে পারেন।
মিনারা বেগম জানান, তিনি ৩৮ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। বিউটি আক্তার জমা করেছিলেন ১০ লাখ টাকা এবং খালিদ সরদার ২০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া জামাল হোসেন ৩ লাখ, জলিল গাজী ৫ লাখ, পান্না ফরাজী ৫ লাখ ৫০ হাজার, বেল্লাল মিয়া ৯ লাখ, রাসেল শরীফ ৮ লাখ ২০ হাজার, গিয়াস মিয়া ৪ লাখ ৫০ হাজার, সজল শেখ ৩ লাখ ৫০ হাজার এবং বাবুল হাওলাদার ১০ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন বলে জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের হিসাবে, দেড় শতাধিক গ্রাহকের মোট জমার পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। আউটলেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এবং রাজুর খোঁজ না মেলায় প্রতিদিনই অনেক গ্রাহক সেখানে ভিড় করছেন। তাদের অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তারা জানিয়েছেন, তাদের হাতে দেওয়া জমার রসিদ ও মোবাইলে পাঠানো এসএমএস যে ব্যাংকের আসল নথি নয়, তা তারা বুঝতে পারেননি।
তাফালবাড়ী বাজার কমিটির সভাপতি আ. রাজ্জাক মৃধা বলেন, রাজুর আচরণ ভালো ছিল বলে মানুষ সহজেই তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন। তিনি আরও বলেন, এখন প্রতিদিনই গ্রাহকেরা তার কাছে অভিযোগ নিয়ে আসছেন। তাদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া ছাড়া বেশি কিছু করার নেই।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, শরণখোলায় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং ঘিরে এমন অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। তাদের দাবি, উপজেলা সদরের রায়েন্দা বাজারের ডাচ-বাংলা ব্যাংকের আরেক এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালকের বিরুদ্ধেও প্রায় দেড় কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের ঘটনা স্থানীয় মানুষের ব্যাংকিং ব্যবস্থার, বিশেষ করে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওপর আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। তারা গ্রাহকদের প্রকৃত ব্যাংক রসিদ, এসএমএস ও হিসাবের তথ্য যাচাই করে লেনদেন করার পরামর্শ দিয়েছেন এবং এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটগুলোর ওপর আরও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বাগেরহাট জেলার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সিনিয়র সেলস ম্যানেজার শেখ ওবায়দুল ইসলাম বলেন, গ্রাহকদের অভিযোগ পাওয়ার পর কর্মকর্তারা তাফালবাড়ী আউটলেট পরিদর্শন করেন এবং সেটি বন্ধ করে দেন।
তিনি আরও বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। যাদের কাছে বৈধ জমার রসিদ আছে, তাদের জেলা শাখায় অভিযোগ করতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র যাচাইয়ের পর যাদের দাবি সঠিক প্রমাণিত হবে, তারা চাইলে আমানতের টাকা ফেরত নিতে পারবেন।’
শেখ ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থলে অভিযোগ নিয়ে আসা গ্রাহকদের কাগজপত্র প্রাথমিকভাবে যাচাই করে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বৈধ জমার স্লিপ পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, বাকি স্লিপগুলোর বেশিরভাগই ভুয়া বলে মনে হয়েছে। তার ভাষ্য, এজেন্ট দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া স্লিপ দিয়ে থাকলেও গ্রাহকেরা তা বুঝতে পারেননি।
‘গত ডিসেম্বর তাফালবাড়ী এজেন্ট আউটলেটে একটি গ্রাহক সমাবেশ করে এ ধরনের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তখন কেউ কোনো অভিযোগ করেননি’, বলেন তিনি। তার মতে, সে সময় অভিযোগ উঠলে বর্তমান পরিস্থিতি হয়তো এড়ানো যেত।
শেখ ওবায়দুল ইসলাম জানান, গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা এবং ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে রাজুর বিরুদ্ধে মামলা করবে ডাচ-বাংলা ব্যাংক।
শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রোকেয়া খানম বলেন, তাফালবাড়ীর ডাচ-বাংলা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থেকে গ্রাহকদের টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে জিডির আবেদন করা হয়েছে।
বিষয়টি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। রাজুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তার বাবা শাহ আলম হাওলাদার বলেন, ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে পিরোজপুরে এক বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন রাজু। ‘সেই থেকে তার মোবাইল বন্ধ। সে কোথায় আছে, তা বলতে পারছি না’, বলেন তিনি।
শাহ আলম হাওলাদার বলেন, তার ছেলে এত মানুষের কাছ থেকে এত টাকা নিয়েছেন–এ কথা আগে কেউ তাকে জানাননি। ‘এখন অনেকেই অভিযোগ নিয়ে আসছেন। কিন্তু এখানে আমার কী করার আছে? এত টাকা শোধ করার সামর্থ্যও আমার নেই’, বলেন তিনি।


