দুর্গাপূজার বাকি আর ছয় দিন। দিন যত ঘনিয়ে আসছে, চট্টগ্রামে ততই বাড়ছে ব্যস্ততা। নগরের বিভিন্ন প্রতিমালয়ে এখন চলছে প্রতিমা তৈরির শেষ ধাপের কাজ। কোথাও মাটির কাজ শেষ করে চলছে রঙের প্রস্তুতি, কোথাও দেবীর মুখমণ্ডলে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে শেষ রেখা। পাশাপাশি পোশাক, চুল ও অলংকারে প্রতিমাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগরেরা।
শুধু প্রতিমা তৈরিই নয়, নগরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপেও চলছে সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও থিমের কাজ এগিয়ে চলছে, কোথাও চলছে আলোকসজ্জা ও মণ্ডপের নকশা তৈরির কাজ। এদিকে দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে নিউমার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজার, জহুর হকার্স মার্কেটসহ নগরের বিভিন্ন বিপণিবিতানেও বাড়ছে ক্রেতাদের আনাগোনা।
সদরঘাট, দেওয়ানজী পুকুরপাড়, এনায়েতবাজার-গোয়ালপাড়া, চট্টেশ্বরী রোড, হাজারী লেন, পাথরঘাটা ও নালাপাড়াসহ নগরের বিভিন্ন প্রতিমালয়ে এখন চলছে ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। একই চিত্র দেখা গেছে চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি, বাঁশখালীসহ জেলার ১৫ উপজেলায়।
চট্টগ্রামে ২ হাজার ৫৬৮ মণ্ডপে পূজা
এবার নগরে ২৯৪টি মণ্ডপে এবং জেলার ১৫টি উপজেলায় ২ হাজার ২৭৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের হিসাবে, এসবের মধ্যে ১ হাজার ৬৫৫টি প্রতিমা পূজা এবং ৬১৯টি ঘট পূজা। গত বছরের তুলনায় এবার জেলায় পূজা বেড়েছে ৭২টি, মহানগরে বেড়েছে দুটি।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তালিকা অনুযায়ী, দক্ষিণ চট্টগ্রামের আট উপজেলায় মোট ১ হাজার ৩৯৬টি পূজার আয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিমা পূজা ৭৯৬টি এবং ঘট পূজা ৬০০টি। উত্তর চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় মোট পূজা ৮৭৮টি। এর মধ্যে প্রতিমা পূজা ৮৫৯টি এবং ঘট পূজা ১৯টি।
চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ জানান, মোট পূজার সংখ্যায় দক্ষিণ চট্টগ্রামে আয়োজন বেশি হলেও প্রতিমা পূজার সংখ্যায় উত্তর চট্টগ্রামে আয়োজন বেশি। অন্যদিকে ঘট পূজায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের আধিক্য রয়েছে।
থিমে বদলাচ্ছে মণ্ডপের চিত্র
প্রতিমার পাশাপাশি পূজামণ্ডপের সাজসজ্জাতেও চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। নগরের উত্তর কাট্টলী কালীবাড়ির সার্বজনীন পূজামণ্ডপের রূপ দিচ্ছেন তন্ময় দাশ। এবার মণ্ডপটির ভাবনা ‘অবিনশ্বর’। এতে জীবন-মৃত্যু এবং সৃষ্টি-বিনাশের চক্র উপলব্ধির সাধনা তুলে ধরা হবে।
অন্যদিকে দক্ষিণ নালাপাড়ায় সাজানো হচ্ছে ‘পাড়া-মহল্লা’ থিমে পূজামণ্ডপ। সেখানে তুলে ধরা হবে পাড়া-মহল্লার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির চিত্র।
মৃৎশিল্পী সুজয় বলেন, এখন প্রতিমাশিল্পীর কাজ শুধু একটি প্রতিমা তৈরি করে দেওয়া নয়। মণ্ডপের ভাবনা, নকশা ও পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখেও তৈরি করতে হচ্ছে দেবীর অবয়ব।
মার্কেটে বাড়ছে ক্রেতার আনাগোনা
দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে নগরের বিভিন্ন মার্কেট ও শপিংমলেও বাড়ছে ব্যস্ততা। নিউমার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজার, জহুর হকার্স মার্কেটসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে পোশাক ও পূজার সামগ্রী নিয়ে প্রস্তুত ব্যবসায়ীরা। রাখা হয়েছে বিশেষ ছাড় ও পুরস্কারের ব্যবস্থা। বিভিন্ন জায়গা চলছে মেলাও।
শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, ধুতি, শার্ট ও প্যান্টসহ বিভিন্ন পোশাক দেখাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিক্রেতারা। পাশাপাশি জুতা, প্রসাধনী ও ইমিটেশনের গহনার দোকানেও রয়েছে ক্রেতাদের আনাগোনা।
বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পোশাকের দোকানে তুলনামূলক বেশি ভিড় দেখা যাচ্ছে। নারীদের মধ্যে শাড়ি ও থ্রি-পিসের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের গাউনের চাহিদাও রয়েছে। শিশুদের জন্যও বিভিন্ন রং ও নকশার পোশাক সাজিয়ে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে ক্রেতাদের উপস্থিতি থাকলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি এখনো জমে ওঠেনি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্রেতাই প্রয়োজনীয় কেনাকাটার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছেন।

কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে শপিং করতে আসা সাথী রানী দে বলেন, পূজা মানেই আনন্দ। নতুন পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার চেষ্টা করছি। তবে এবার সবকিছুর দাম তুলনামূলক বেশি। তাই বাজেটের মধ্যে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে হচ্ছে।
প্রবর্তক মিমি সুপার মার্কেটের ওয়ালিয়া’স ডায়েরির এক বিক্রেতা বলেন, পূজা উপলক্ষে মিমি সুপার মার্কেটে চলছে মিমি ফেস্ট। চলছে স্পেশাল ছাড়।
তিনি বলেন, পূজা উপলক্ষে কিছুটা বেচাকেনা বেড়েছে। তবে আমরা যে পরিমাণ ক্রেতা আশা করেছিলাম, এখনো তেমনটা হয়নি। পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসবে, বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছি।
অ্যাপোলো শপিং সেন্টারের নওফা ফ্যাশন বুটিকসের স্বত্বাধিকারী সেলিম জাহাঙ্গীর বলেন, দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে দোকানে বিক্রি বাড়তে শুরু করেছে।
চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
২০২৪ সালের শারদীয় দুর্গাপূজায় জেএম সেন হলের স্টেজে সৃষ্ট বিব্রতকর পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধে এবার অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বলে জানিয়েছে পূজা উদযাপন পরিষদ। তাদের মতে, এবার পূজার সকল অনুষ্ঠানমালা আগেই নির্ধারণ ও লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা থাকবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন এবং অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিল্পী ও পরিবেশনাকারীদের তালিকাও পূর্বেই প্রস্তুত করা হবে।
চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিখিল কুমার নাথ বলেন, আমরা এ উদযাপন যেন স্বতঃস্ফূর্ত করতে প্রশাসনের সহযোগিতা ও আন্তরিকতা আশা করছি। আগামী ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের সঙ্গে আমাদের সভা রয়েছে। মণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রতিবছরের মতো এবারও জেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। বর্তমান সরকার এ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
নিরাপত্তা ও সার্বিক প্রস্তুতি বিষয়ে সিএমপির সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে পূজার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সবকিছু যথাযথভাবে বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এবার মহালয়া ১০ অক্টোবর এবং ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে মূল দুর্গাপূজা শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে শেষ হবে।


