গেল মাসখানেক বাংলাদেশের প্রধান সংবাদপত্র ও অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে শুধু বড় বড় অপরাধের খবর। এসব দেখে মনে হয় দেশে আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল—সর্বত্র জমি দখল, সশস্ত্র তাণ্ডব, কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া চাঁদাবাজি এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনজীবন আতঙ্কগ্রস্ত।
বিশেষ করে ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাণ্ডব, ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে সশস্ত্র হামলা এবং কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র অপ্রতীম হত্যাকাণ্ড—এই তিনটি ঘটনা সেপ্টেম্বর মাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম ধস এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক ও নীতিগত ব্যর্থতার প্রতীকী উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব ঘটনার দিকে তাকালে অপরাধের ধরণ ও বেপরোয়া ভাব স্পষ্ট হয়। মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত ৫০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’-এ ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে আড়াইশর বেশি মুখোশধারী সন্ত্রাসী রামদা, শাবল ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। কেন্দ্রটির দায়িত্বরত নিরপত্তা কর্মীদের হাত-পা বেঁধে ভবন ভাঙচুর করা হয়, কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মূল্যবান সম্পদ লুট করে নেওয়া হয়।
শত কোটি টাকার জমি গ্রাস করার উদ্দেশ্যেই যে এই হামলা চালানো হয়েছে, তা উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে। এই ঘটনার নেপথ্যে মদতদাতা হিসেবে এসেছে সরকারি দলের স্থানীয় সংরক্ষিত সংসদ সদস্যের নাম। আর প্রকাশ্যে হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন তারই মদতে চলা হানিফ মিয়া ও তার ভাড়াটে ক্যাডাররা।
সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হলো ৫০ বছরের একটি সেবামূলক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে শত শত লোক ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাণ্ডব চালায়, অথচ কাছেই থানা থাকা সত্ত্বেও পুলিশ ঘটনাস্থলে এসেছে দেরিতে। আবার ঘটনাস্থলে এলেও হামলাকারীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেনি।
একই ধরণের দৃশ্য দেখা যায় রাজধানীর ইসিবি চত্বর সংলগ্ন নিউগিনি প্রপার্টিজের হাউজিং প্রজেক্টে। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে সেখানে স্থানীয় ভাসানটেক ও সংলগ্ন এলাকার কিশোর গ্যাং সিন্ডিকেট এবং সশস্ত্র রাজনৈতিক ক্যাডাররা একযোগে হামলা চালায়। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি, ৫০ কোটি টাকার সম্পদ লুট এবং অফিসের ভেতরে থাকা কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ একাধিক স্থাপনায় নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়। সংবাদমাধ্যমের খবর, দীর্ঘদিন ধরে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং প্রজেক্টের জমি দখল করতেই এই হামলা হয়। এখানে যুক্ত ছিল স্থানীয় শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্র এবং তাদের ছায়াতলে বেড়ে ওঠা বেপরোয়া কিশোর গ্যাং। পুলিশকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা সময়মতো ঘটনাস্থলে আসেনি এবং হামলাকারীরা তাণ্ডব শেষ করে নির্বিঘ্নে স্থান ত্যাগ করে।
নগর এলাকার জমি দখল ও চাঁদাবাজির পাশাপাশি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংকট কতটা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা প্রকাশ পায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ডে। কুমিল্লার লালমাই পাহাড়সংলগ্ন নির্জন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় সপ্তম শ্রেণীর এই শিক্ষার্থীর লাশ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, কেবল একটি আইফোন ছিনতাই ও কয়েক হাজার টাকার লোভেই অপ্রতীমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তুহিন নামের এক তরুণ ও তার সঙ্গীরা। একজন শিক্ষকের সন্তান নিজের শহরের কাছেই মোবাইল ছিনতাইকারীদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারায়—এ ঘটনা প্রমান করে যে রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের চলাচলের ন্যূনতম নিরাপত্তা অবশিষ্ট নেই।
এই তিনটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধ প্রতিরোধে এবং নাগরিকদের সুরক্ষায় কেন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। প্রথমত, পুলিশের রেসপন্স টাইম ও আস্থার চরম ঘাটতি। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা ইসিবি চত্বরের ঘটনায় অপরাধীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে সশস্ত্র তাণ্ডব চালিয়েছে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং মোড়ে মোড়ে টহল থাকার কথা যে স্থানে, সেখানে এত বড় অপরাধী দল দীর্ঘসময় ধরে মহড়া দিল অথচ পুলিশ তা রুখতে ব্যর্থ হলো। এটি কোনো সাধারণ উদাসীনতা নয়, বরং পুলিশের মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা নজরদারি এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক হাতবদল ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটের ধারাবাহিকতা। বিভিন্ন সংবাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশজুড়ে সরকার বা ক্ষমতার রদবদল ঘটলেও রাজপথ, আবাসন প্রকল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চাঁদাবাজ ও জমি দখলকারী সিন্ডিকেটের কোনো রদবদল হয়নি; কেবল মাস্টারমাইন্ডদের দলীয় পরিচয় বদলেছে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা কিশোর গ্যাং ও সশস্ত্র ক্যাডারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে কিংবা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।
তৃতীয়ত, অপরাধের বিচার না হওয়া ও আইনের শিথিলতা। অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটায় যে কিশোর অপরাধী ও ছিনতাইকারী চক্র, তারা জানে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। থানা পর্যায় থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত মামলার তদন্তে ধীরগতি ও দুর্বল চার্জশিটের কারণে অপরাধীরা সহজে পার পেয়ে যায়, যা নতুন অপরাধীদের আরো বেশি বেপরোয়া করে তোলে।
পুরো সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের যে ভূমিকা দেখা গেছে, তা কেবল আত্মতুষ্টিমূলক বক্তব্য এবং পরিসংখ্যান প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বারবার বক্তৃতা-বিবৃতিতে চিরুনি অভিযান, একদিনে কয়েকশত গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বা মাদক উদ্ধারের খতিয়ান তুলে ধরে দাবি করেছেন: ‘পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।’ এমনকি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভাল বলেও দাবি করেন তারা।
কিন্তু সাধারণ নাগরিক যখন সংবাদপত্রের পাতা খোলে, তখন তারা দেখে কোটি টাকার জমি দখল হচ্ছে, হাসপাতাল ভাঙচুর হচ্ছে, গুলি ফুটছে, শিশু খুন হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে মূল গলদ হলো—তারা মূল সমস্যা অস্বীকার করে কেবল ‘উপসর্গ’ ঢাকার চেষ্টা করে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম পরিবর্তন বা পদমর্যাদা বিন্যাসের মতো প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বললেও, বাহিনীর ভেতরের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও জবাবদিহিতাহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেয়নি। যেকোনো বড় ঘটনা ঘটার পর দু-একজন অপরাধীকে ধরে প্রেস ব্রিফিং করাই যদি সফলতার মাপকাঠি হয়, তবে মূল অপরাধী চক্র কখনোই নির্মূল হবে না। রাড্ডা কিংবা নিউগিনি প্রপার্টিজের মতো স্থানে হামলার পর অপরাধীরা যদি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় এবং রাজনৈতিক বলয় রক্ষা করতে সক্ষম হয়, তবে তার দায় সম্পূর্ণভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক ব্যর্থতার ওপরই বর্তায়।


