একদিকে দেশে ইন্টারনেটের বাড়তি চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে প্রতিনিয়ত ব্যান্ডউইথ আমদানি বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে সাগরের তলদেশে আটকে আছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্প।
দেশীয় তিনটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এসেছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় অনুমতি না পাওয়ায় প্রায় তিন বছর ধরে আটকে আছে সাগরে ক্যাবল বসানোর কাজ।
অন্তর্বর্তী সরকার একপর্যায়ে সাগরে ক্যাবল বসানোর কাজ স্থগিত করে মোট চাহিদার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ব্যান্ডউইথ আমদানির সীমা বেঁধে দিয়েছিল। অবশ্য পরে এক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সেই সীমার ওপর স্থগিতাদেশ দেয়।
এদিকে, ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানি বেড়ে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের মোট চাহিদার যেখানে আগে প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করা হতো, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশে।
মেটাকোর সাবকম, সামিট কমিউনিকেশন্স ও সিডিনেট কমিউনিকেশন্স—এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে গঠিত ৩টি সাবমেরিন ক্যাবলের মোট ক্ষমতা ৫১ টেরাবিট প্রতি সেকেন্ড (টিবিপিএস)। আগস্টের সময়সীমা পার হয়ে গেলেও ক্যাবলগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পটির কাজ মূলত ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি এখনো আটকে আছে। ভাড়া করা জাহাজ এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞরা অনুমোদনের অপেক্ষায় বসে আছেন। কিন্তু কক্সবাজার থেকে মূল আন্তর্জাতিক ক্যাবলের সঙ্গে সংযোগ দেওয়ার জন্য ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ শাখা ক্যাবল বসানোর কাজ এবার নিয়ে টানা তিন বছর পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছে।
বাংলাদেশের জলসীমায় কাজ করতে হলে ক্যাবল স্থাপনকারী জাহাজকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। আর ঠিক এই জায়গাতেই আটকে গেছে প্রকল্পটি।
মেটাকোর সাবকমের সিইও আমিনুল হাকিম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এনএসআই থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ায় জাহাজগুলো আমাদের জলসীমায় ঢুকতে পারছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারে যে-ই থাকুক না কেন, দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাই তো আমাদের এই কোটি টাকার বিনিয়োগের অনুমোদন দিয়েছিল। তাই আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ হওয়া উচিত নয়।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এনএসআই প্রধানকে পাঠানো ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের (পিটিডি) ২৯ জুলাই একটি গোপন চিঠির কপি পেয়েছে টাইমস। ‘জরুরি ও গোপনীয়’ হিসেবে চিহ্নিত সেই চিঠিতে ক্যাবল বসানোর কাজে যুক্ত ‘সিএস ব্লু’ ও ‘এন্ডেভার’ নামের দুটি জাহাজের আগমনী অনাপত্তিপত্র (এনওসি) না দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়পত্রের আবেদন করার পরই এই চিঠি পাঠায় পিটিডি।
চিঠিতে পিটিডি যুক্তি দেয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল (বিএসসি) কোম্পানিকে আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয় এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অনুমোদন না দেওয়ার কথা বলা হয়।
চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়, ‘পিটিডির সিদ্ধান্ত ছাড়া আপনারা কোনো এনওসি দেবেন না।’তবে লাইসেন্স ভঙ্গের এই অভিযোগ একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছেন আমিনুল হাকিম।
তিনি জানান, দেশে যখন ডলার সংকট চলছিল, তখন একই নেটওয়ার্কের ৩টি প্রতিষ্ঠানের ৩ জোড়া ক্যাবলের শুধু বাইরের সুরক্ষা আবরণটি একত্রিত করা হয়েছিল, মূল ক্যাবলগুলো আলাদা ছিল। বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানোর জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরামর্শ ও অনুমতি নিয়েই এ কাজ করা হয়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘সরকারের এক দপ্তর আপনাকে একটা কাজ করার অনুমতি দেবে, আর অন্য দপ্তর এসে তা আটকে দেবে—তাহলে আমরা যাব কোথায়?’
মঙ্গলবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন, সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবসায় সরকারি একচেটিয়া প্রভাব বা ব্যবসা ধরে রাখতেই পিটিডি এই অনুমোদন আটকে দিচ্ছে।
বিএসসি সুবিধা নিচ্ছে দাবি করে আমিনুল হাকিম বলেন, ‘প্রতিযোগিতাহীন বাজার পেয়েই সরকারি কোম্পানিটি এত মুনাফা করছে।’
তিনি বলেন, ‘শেয়ারবাজারে থাকা এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ সাল থেকে মাত্র ৮২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকারও বেশি নিট মুনাফা করেছে। তাদের নিট মুনাফার হার প্রায় ৪৫ শতাংশ, যা বিরল। অথচ এই চড়া দামের কারণে সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী ইন্টারনেট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি স্বাভাবিক ব্যবসা হিসেবে আমরা ১০ থেকে ২০ শতাংশের মতো মুনাফাতেই সন্তুষ্ট।’
আমিনুল হাকিম মনে করেন, বাজারে বেশি সক্ষমতা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকলে ইন্টারনেটের দাম অনেকটাই কমে আসবে।
তিনি বলেন, ‘সরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থার কারণে এখন প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথের দাম ১২০ টাকা। আগামী বছর আমাদের কাজ করার সুযোগ দিলে আমরা এই দাম কমিয়ে ৬০-৭০ টাকায় নামিয়ে আনতে পারব।’
ইন্টারনেট ব্যবহারের দিক থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। তাই দেশে দ্রুতগতির ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের বিস্তার জরুরি। ভিয়েতনামে যেখানে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের সুবিধা ২৪ শতাংশ মানুষ পায়, বাংলাদেশে তা মাত্র ৮ দশমিক ১ শতাংশ।
বিএসসি সৌজন্যে বাংলাদেশ মাত্র দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত। বিপরীতে ভিয়েতনামে ৬টি, ভারতে ২০টির বেশি, মালয়েশিয়ায় ২৪টির বেশি এবং থাইল্যান্ডে ১২টিরও বেশি সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, এই চিত্র বাংলাদেশের ‘ডিজিটাল’ স্বপ্নের সঙ্গে একেবারেই মেলে না। তারা জানান, সরকার লভ্যাংশ হিসেবে যে টাকা পায় তা ছাড়াও শুধু বিএসসি কর্মকর্তারাই মুনাফা থেকে প্রায় ৭২ কোটি টাকা বোনাস পেয়েছেন।
আমিনুল হাকিম বলেন, ‘বেসরকারি খাতকে আসতে দিলে তারা এই বিশাল অঙ্কের বোনাস হারাবে, তাই তারা প্রতিযোগিতা চায় না।’
বিএসসির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে পিটিডি সচিবের বসে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আমিনুল হাকিম। তিনি বলেন, একই ব্যক্তি দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণেই পিটিডি সচিবালয় এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বিএসসিপিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাজ্জাদ বিন মুস্তাইনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসসির এক কর্মকর্তা জানান, তারা বিভিন্ন বিশেষ অফারের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক কম দামে ব্যান্ডউইথ বিক্রি করছেন।
তিনি আরও জানান, এসএসডব্লিউ ৪ ও ৫ ক্যাবল থেকে পাওয়া ৭ দশমিক ২ টিবিপিএস সক্ষমতার পর, ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে আগামী বছর এসএমডব্লিউ ৬ ক্যাবল থেকে আরও ৩৪ টিবিপিএস যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ২০৩৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৪২০ থেকে ৪৫০ টিবিপিএস ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন হবে।
বিএসসির লোকসানের ভয়কে অযৌক্তিক দাবি করে হাকিম বলেন, কিছুটা কম মুনাফা করলেও কোম্পানিটি ভালোভাবেই টিকে থাকতে পারবে।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্য এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘কাজের বড় অংশ শেষ হওয়ার পরও এত বড় একটি বেসরকারি বিনিয়োগ আটকে থাকা খুবই দুঃখজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র তার আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে। তারা ভাবছে বাংলাদেশে চুক্তির কোনো মূল্য নেই।’
দেশের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে এখন সবচেয়ে বেশি দরকার নতুন বিনিয়োগ, আর সেখানে উদ্যোক্তাদের এভাবে বাধা দিলে বাজারে খারাপ বার্তা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিডিনেটের সিইও মশিউর রহমান টাইমসকে বলেন, সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির এই উল্লম্ফন।
তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে ভারত থেকে ৭০ শতাংশ ব্যান্ডউইথ আমদানির নজির আর নেই। এই তিন বছরে ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আনতে যে টাকা খরচ হয়েছে, তা দিয়ে দেশের নিজস্ব একটা বিশাল সাবমেরিন ক্যাবল তৈরি হয়ে যেত।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘এশিয়ান ক্যাবল সিস্টেম’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি থাকতে পারে বলে একটা গুঞ্জন ছিল। তবে কনসোর্টিয়াম প্রমাণ করেছে, সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রযুক্তিগুলো তারা যুক্তরাষ্ট্রেরই বন্ধুপ্রতিম পশ্চিমা দেশগুলো থেকে কিনেছে। ফলে এই তর্কের এখন আর ভিত্তি নেই।
তবে সরকারি একচেটিয়া মনোভাবের কারণে একটা বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে—গুগল বা মেটার মতো বিশ্বসেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করতে আদৌ উৎসাহ পাবে কি না।
আমিনুল হাকিম বলেন, ‘কোনো বড় পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান সরকারি একচেটিয়া ব্যবসা পছন্দ করে না।’ তিনি ইতিমধ্যে কয়েকটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এখন যদি বেসরকারি ক্যাবল চালুর অনুমতি না দেওয়া হয় এবং আমদানির ওপর রাশ না টানা হয়, তবে আগামী কয়েক বছরে দেশের ৯০ শতাংশ ব্যান্ডউইথই ভারত থেকে আমদানি করতে হবে।
মেটা বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামো খাতে ২ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করে থাকে। তাদের বাংলাদেশে আনতে হলে আমাদের ভালো পরিবেশ দিতে হবে, যার মধ্যে অন্যতম হলো ৫০ টিবিপিএসের বেশি সক্ষমতার উচ্চগতির ইন্টারনেট।
আমিনুল হাকিম আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হয়ে আমাদের এখন প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কারও কাছে যাওয়ার পথ নেই।’
সময়মতো কাজ শেষ না করতে পারায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে জরিমানা গুনতে হবে। পাশাপাশি আয় শুরু না হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন তারা।
মূলত শীতের দিনে সমুদ্র শান্ত থাকলে ক্যাবল বসানোর কাজ করতে হয়। আর এক মাসের মধ্যে ছাড়পত্র না পেলে এই শীতের মৌসুমটাও হাতছাড়া হয়ে যাবে, যা ২০২৪ সালের শেষেই শেষ হওয়ার কথা ছিল।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বিএসসির চেয়ারম্যান ও পিটিডি সচিব বিলকিস জাহান রিমির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করা হয়, যার বড়জোর এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করতে পারে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসসি।


