শতভাগ নিবন্ধনে শক্তিশালী স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন

শতভাগ নিবন্ধনে শক্তিশালী স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন
Advertisement
Advertisement

নাগরিক হিসেবে জীবনের শুরু এবং শেষের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রমাণের নাম জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন। এটি ছাড়া রাষ্ট্রের চোখে একজন মানুষ অদৃশ্য থাকে, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে পোহাতে হয় সীমাহীন ঝামেলা। অথচ বাংলাদেশে প্রতি দুজন মানুষের একজন নিবন্ধনহীন। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার যথাক্রমে ৫০ এবং ৪৭ শতাংশ, যা  বৈশ্বিক গড় হারের তুলনায় অনেক কম।

জন্ম নিবন্ধন না থাকার অর্থ হলো বিশাল সংখ্যক শিশু কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে সম্পূর্ণ ‘অদৃশ্য’ থেকে যাওয়া, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে জাতীয় পরিকল্পনায়। দেশে ঠিক কত ডোজ বিভিন্ন ধরনের টিকা দরকার, কোন অঞ্চলে অপুষ্টির শিকার শিশুর সংখ্যা বেশি, কিংবা কোথায় নতুন শিশু চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করা জরুরি, তার কোনো সঠিক হিসাব বা স্পষ্ট ধারণা নীতি নির্ধারকদের কাছে থাকে না। তেমনি মৃত্যু নিবন্ধন না থাকার পরিণতিও ভয়াবহ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ কোন বয়সে, কোথায় এবং কী রোগে মারা যাচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানই হলো যেকোনো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রধান কম্পাস। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার কিংবা ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ কোন বয়সে এবং কোন অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি থাবা বসাচ্ছে, তা যদি জানা না থাকে, তবে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্মিত স্বাস্থ্য অবকাঠামো ভুল পথে পরিচালিত হতে বাধ্য।

ডিজিজ সার্ভেইল্যান্স বা রোগ পর্যবেক্ষণ/নজরদারি ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো ‘রিয়েল-টাইম ডেটা’। ধরা যাক, কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামে চার-পাঁচজন মানুষ হঠাৎ কোনো অজানা জ্বরে মারা গেলেন। যদি তাদের মৃত্যু তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধিত না হয় এবং মৃত্যুর কারণ নথিবদ্ধ না থাকে, তবে সরকার জানতেও পারবে না যে সেখানে নতুন কোনো সংক্রামক ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। যখন স্বাস্থ্য বিভাগ খবর পাবে, ততদিনে হয়তো প্রাদুর্ভাবটি মহামারী রূপ নিয়ে ফেলেছে। তাছাড়া, মহামারীকালে যখন দ্রুত টিকা বা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বিতরণ করার প্রয়োজন পড়ে, সঠিক নাগরিক নিবন্ধনের তথ্য না থাকলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পুরোপুরি বাদ পড়ে যায়। একটি অসম্পূর্ণ ডেটাবেজ নিয়ে কোনো দেশেই মহামারী প্রতিরোধে সফল কৌশল গ্রহণ সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির শিকার। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে তছনছ করে দেয়। একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর যখন উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে, “কতজন মানুষ নিখোঁজ বা মারা গেছেন?” যদি কোনো ইউনিয়ন পরিষদে সেই এলাকাবাসীদের সঠিক জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের তথ্য না থাকে, তবে দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণ ও সরকারি সহায়তা পথ হারিয়ে ফেলে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় ঘটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রক্রিয়ায়। একজন ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য সময়মতো ডেটাবেজে আপডেট না করায় তৈরি হয় ভুয়া সুবিধাভোগী। মৃত স্বামীর মৃত্যু নিবন্ধন না থাকায় দেখা যায় অনেক দুস্থ নারী বিধবা ভাতার টাকা পান না। ফলে প্রকৃত দুর্যোগাক্রান্ত ও প্রান্তিক মানুষগুলো রাষ্ট্রীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত থেকে যায়।

আরও পড়ুন

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, মানুষ কেন নিবন্ধনে অনাগ্রহী? উত্তর লুকিয়ে আছে ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’-এর কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৬৭ শতাংশ শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরাসরি এই নিবন্ধন সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে একজন অভিভাবককে ছুটতে হয় ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে। সেখানে গিয়ে অনলাইন পোর্টালের প্রযুক্তিগত জটিলতা, বানান ভুলের ভোগান্তি আর ফি সংক্রান্ত হয়রানির মুখে পড়ে অনেকেই হাল ছেড়ে দেন। নিবন্ধনহীন থেকে যায় লাখো শিশু।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬.৯ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সকল নাগরিকের জন্য সর্বজনীন আইনি পরিচয় নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সময় খুবই অল্প, কিন্তু লক্ষ্য পূরণে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে আইনগত সংষ্কার জরুরি। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন ২০০৪ সংশোধন করে প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব আইনিভাবে দিতে হবে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথেই যেন তারা নিবন্ধনের আওতায় চলে আসে। উল্লেখ্য, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব ব্যাক্তির বদলে হাসপাতালকে দেওয়ার মাধ্যমে শতভাগ নিবন্ধন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। একই সাথে, কারিগরি জটিলতা দূর করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে হবে। নিবন্ধনকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রচারণা, মাঠপর্যায়ে লোকবলের ঘাটতি দূর করা, নিবন্ধনকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কেবল একটি তালিকা বা ডিজিটাল নম্বর নয়; এটি একটি দেশের টেকসই স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন অবকাঠামো ও দুর্যোগ মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার। আমরা কি আমাদের লক্ষ লক্ষ নাগরিককে ‘অদৃশ্য’ রেখে একটি অসুস্থ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে হেঁটে যাব, নাকি সঠিক আইন ও প্রযুক্তির ব্যবহারে ২০৩০ সালের মধ্যেই সুরক্ষিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ গড়ে তুলব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

লেখক: মাশিয়াত আবেদিন, কোঅর্ডিনেটর, এবং এবিএম জুবায়ের, নির্বাহী পরিচালক, প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad