পাহাড়ে ৩ কমিটি: ‘সামরিকায়নের’ আশঙ্কায় ৫২ নাগরিকের প্রতিবাদ

পাহাড়ে ৩ কমিটি: ‘সামরিকায়নের’ আশঙ্কায় ৫২ নাগরিকের প্রতিবাদ
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ। ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক তিনটি নতুন কমিটি গঠনের জারি করা প্রজ্ঞাপনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ৫২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের সমস্যা টিকিয়ে রেখে ‘অধিকতর সামরিকায়নের মাধ্যমে পাহাড়ীদের দমন-পীড়নের পথ উন্মুক্ত’ করার প্রয়াস হিসেবে এই পদক্ষেপকে আখ্যা দিয়েছেন তারা।

বিবৃতিতে নাগরিকেরা উল্লেখ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট মূলত একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। পাহাড়ের আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার সুরক্ষার দাবিকে উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে সামরিকায়নের মাধ্যমে দমন-পীড়ন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ফলে প্রায় ১ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। পরবর্তী সময়ে সেনাক্যাম্প স্থাপন ও সম্প্রসারণের ফলে স্থানীয় কৃষি, পরিবেশ, জনমিতি ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে দুই যুগের বেশি সময় ধরে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংঘাত প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে, যেখানে বহু সামরিক-বেসামরিক নাগরিক এবং নিরীহ আদিবাসী মানুষ হতাহত ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

বিবৃতিদাতারা বলেন, বিএনপি সরকারের সময় (১৯৯১-১৯৯৫) ১৩ বারসহ ধারাবাহিক ২৬টি বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তি সই হলেও ২৯ বছরে এর মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে পাহাড়ে বারবার সাম্প্রদায়িক হামলায় অন্তত সাতজন আদিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পাহাড়ের তিনটি আসনে বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ী করার মাধ্যমে জনগণ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি প্রতিনিধি না বসিয়ে অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগে জনদাবিকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার ঘোষিত তিনটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে ‘জাতীয় কমিটি’, স্বরাষ্ট্রসচিবকে সভাপতি করে ‘নির্বাহী কমিটি’ ও চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির প্রধানকে সভাপতি করে ‘পরামর্শক কমিটি’ গঠন করা হয়। এর মধ্যে দুটি কমিটিকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) কর্তৃক অবকাঠামো ও সচিবালয় সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও কর্তৃত্বপরায়ণ’ বলে ক্ষোভ জানান নাগরিকেরা।

বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, গোয়েন্দা ও সামরিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পাহাড়ের সমস্যা সমাধানের এই চেষ্টা বিএনপি ঘোষিত ‘রেইনবো নেশন’ ধারণার সঙ্গে চরম সাংঘর্ষিক এবং তা অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও সংহতির পথ রুদ্ধ করবে। অতীতের ব্যর্থ সেনাকৈন্দ্রিক নীতি ছেড়ে অবিলম্বে এসব কমিটি গোয়েন্দা-নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে পুনর্গঠন করার এবং পার্বত্য চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়নে আদিবাসী ও সব বৈধ প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানান তারা।

বিবৃতিতে সইকারীদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না ও সুব্রত চৌধুরী, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা ও জোবাইদা নাসরীন, গবেষক পাভেল পার্থ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক হিরণ মিত্র চাকমা এবং মানবাধিকার কর্মী মো. নুর খানসহ ৫২ জন ব্যক্তি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর